সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

তাবলীগ জামাতের পক্ষে ও বিপক্ষে

Tabligher Pokkhe o Bipokkhe

৮৬৭৪ : তাবলীগ জামাত – খুঁটিনাটি

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ইসলামের দিকে ডাকার জন্য ৪০ দিন এবং ৪ মাস এর জন্য যাওয়া – এ বিষয়ে ইসলামের বিধান কী ?

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য ।

তাবলীগ জামাত হল এমন একটি দল যারা ইসলামের জন্য কাজ করছে। আল্লাহ্‌ তায়ালার প্রতি মানুষকে ডাকার (দাওয়াহ) ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করা যায় না। তবে অন্যান্য অনেক দলের মত তাদেরও কিছু ভুল রয়েছে। যেগুলো সম্পর্কে আলোচনা  করা দরকার। যদিও এই ভুলগুলো তাবলীগ জামাত যে সমাজ বা পরিবেশে কাজ করছে তার উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যে সমাজে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর মতাদর্শ এবং ইসলামী জ্ঞান ও আলেমদের প্রভাব ব্যাপক , সেক্ষেত্রে ভুলগুলো কম হয়ে থাকে। তবে অন্য সমাজে তা বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। তাদের ভুলগুলোর কয়েকটি হলঃ

(০১) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর আকীদা ধারন না করা। তাবলীগ জামাত এর অনেক সদস্য এবং এমনকি কিছু নেতাদের মাঝেও আক্বীদার বৈচিত্র্যতা থেকে এটা পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যায়।

(০২) শরীয়াহভিত্তিক জ্ঞানের প্রতি গুরুত্ত্ব না দেয়া ।

(০৩) কোরআনের কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যা। যেমন তারা জিহাদ বিষয়ক আয়াতগুলোকে “দাওয়াহর (মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা) উদ্দেশ্যে বের হওয়া” – এই হিসেবে ব্যাখ্যা করে। যে আয়াতগুলোতে “খুরুজ (বের হওয়া)” শব্দটি আছে সেগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা তারা করে থাকে।  

(০৪) আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দেয়ার কাজে বের হওয়ার বিশেষ পদ্ধতিকে তারা ইবাদাতের কাজ হিসেবে গ্রহন করেছে। তাদের এই কিছু সংখ্যক দিন এবং মাসকে নির্দিষ্ট করে নেবার

বিশেষ পদ্ধতির পক্ষে কোরআন ও হাদিসের দলিল দিতে গিয়ে তারা কোরআন ও হাদিসের ভুল উদ্ধৃতি/ব্যাখ্যা করছে। তাদের দাওয়াত দেওয়ার এই বিশেষ পদ্ধতি যা তারা কোরআন ও হাদিস সম্মত মনে করে থাকে, পৃথিবীব্যাপী তাবলীগের সকল জামাতের মধ্যে প্রচলিত।

(০৫) তাদের কিছু কিছু কাজ ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক নয়। উদাহরণসরূপ, তাদের ভিতরে কোন দল যখন দাওয়াত দেয়ার কাজে বের হয়, তখন তারা একজনকে দোয়া করার দায়িত্ব দিয়ে যায়। এবং তারা মনে করে দাওয়াত দেয়ার কাজে ব্যর্থতা ও সাফল্য ঐ দোয়াকারী ব্যক্তির আন্তরিকতা এবং তার দোয়া কবুল হয়েছে কি হয়নি তার উপর নির্ভর করে।

(০৬) যয়ীফ (দুর্বল) ও মওযু (জাল) হাদিছের উপর আমল ও এর প্রচার তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আল্লাহর রাস্তায় মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার কাজে যারা নিয়োজিত, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজ শোভনীয় নয় (বেমানান)।

(০৭) তারা মুনকারাত (খারাপ কাজ) নিয়ে বলেন না। ভাল কাজের আদেশ করাকেই তারা যথেষ্ট মনে করেন। এজন্য দেখা যায়, সমাজে বহুল প্রচলিত খারাপ কাজ নিয়ে তারা কোন কথা বলেন না। যদিও এই উম্মতের স্লোগান হল:

“আর তোমাদের মধ্যে এমন কোন দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎ কাজের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের (আল্লাহর একাত্ববাদ এবং সে সকল কাজ যা ইসলাম করার আদেশ দেয়) এবং নিষেধ করবে মন্দ কাজের (শিরক, কুফর এবং ইসলামে নিসিধ কাজ গুলো) এবং তারাই হল সফলকাম।”

– সূরা আল ইমরান: সূরা – ০৩: আয়াত – ১০৪

সুতরাং তারাই সফলকাম যারা ভালো কাজে আদেশের পাশাপাশি মন্দ কাজেরও নিষেধ করে , তারা নয় যারা কেবলমাত্র এদুটির একটি করে।

(০৮) তাদের মধ্যে কেউ কেউ আত্নতুষ্টিতে ভোগেন এবং অহংকারী হয়ে পড়েন। এর ফলে তাদের অনেকের মাঝেই অন্যদেরকে অবজ্ঞা করার মানসিকতা তৈরি হয়। এমনকি অনেক বিজ্ঞ আলেমদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিষ্ক্রিয় বলে আখ্যা দেয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মানুষের সামনে নিজেদেরকে জাহির করেন। তারা যে, অনেক দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন, অনেক কিছু দেখেছেন ইত্যাদি ব্যাপারে বলে বেরান, যা কোন ভাল ফলাফল বয়ে আনে না।

(০৯) তারা দাওয়াত দেয়ার কাজে ভ্রমণে বের হওয়াকে অন্যান্য অনেক ইবাদতের চেয়ে উত্তম মনে করেন। যেমন জিহাদ, জ্ঞানার্জন করা। যদিও এদুটি কাজ পরিস্থিতি সাপেক্ষে কারো কারো জন্য বাধ্যতামূলক।

(১০) তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন দুঃসাহস দেখায় যে ফতওয়া পর্যন্ত দেন এবং তাফসীর ও হাদিস আলোচনা করেন। কারন তারা জামাতে আসা সবাইকেই (এদের মধ্যে অনেক নওমুসলিম কিংবা সবে মাত্র আল্লাহর হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছেন এমন ব্যাক্তিও থাকেন) দাওয়াহ এবং ব্যাখ্যা করার জন্য বলেন। ফলে অনেক সময়ে দেখা যায়, এমন একজন ব্যক্তি ইসলামের বিধান, হাদিস এমনকি কোরআনের আয়াত সম্বন্ধে আলোচনা করছেন যার এ বিষয়ে তেমন কোন জ্ঞান নেই কিংবা এ বিষয়ে তারা কোন আলেমদের ব্যাখ্যাও শোনেননি।

(১১) তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। এ বিষয়ের ভয়াবহতা নিয়ে ৩০৪০ নং প্রশ্নের উত্তরে আমরা আলোচনা করেছি।

এ সকল কারণে আলেমগণ সাধারণ মানুষকে তাবলীগ জামাতে যেতে নিষেধ করেন। তবে যাদের সঠিক জ্ঞান রয়েছে এবং তাবলীগ জামাতের ভুলগুলো সংশোধন করার মাধ্যমে তাদের সাহায্য করতে চান তাদের কথা আলাদা।

তবে মানুষকে তাবলীগ জামাত থেকে একেবারে আলাদা করে ফেলা উচিত হবে না। বরং আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে দেয়ার এবং তাদেরকে উপদেশ  দেয়ার যাতে তারা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজেদের শুদ্ধ করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন।

নিম্নে তাবলীগ জামাত সম্পর্কে  কয়েকজন আলেমদের ফতওয়া তুলে ধরা হল: 

(০১) ‘শেখ আব্দুল আযিয বিন বায’ বলেনঃ

“তাবলীগ জামাতের সদস্যদের আক্বীদার ব্যাপারগুলো সম্পর্কে যথাযথ পরিষ্কার ধারণা নেই। তাই তাদের সাথে জামাতে যাওয়া যাবে না। তবে যাদের আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহ’র আক্বীদা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রয়েছে তারা যেতে পারেন। এর ফলে তারা তাবলীগ জামাতের সদস্যদের সঠিক পথনির্দেশ দিতে পারবেন, উপদেশ দিতে পারবেন এবং তাদেরকে ভাল কাজে সাহায্য করতে পারবেন, কেননা তাবলীগ জামাত খুব সক্রিয় একটি দল। তবে তাদের আরো জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন, এবং এমন কাউকে প্রয়োজন যার তাওহিদ ও সুন্নাহ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রয়েছে, যাতে তিনি এই দলটিকে যথাযথভাবে পথনির্দেশ দিতে পারেন। আল্লাহ আমাদের ইসলামকে যথাযথভাবে বোঝার এবং ইসলামের প্রতি অবিচল থাকার তৌফিক দান করুক।

– মাজমু ফাতাওয়া আল শাইখ ইবন বায, ৮/৩৩১

(০২) ‘শেখ সালিহ আল ফাওজান’ বলেনঃ

“তাবলীগ জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বলতে যা বুঝায় প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া মানে তা নয়। আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বলতে প্রকৃতপক্ষে জিহাদে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তারা আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বলতে যা বুঝান তা মূলত বিদআত এবং সালাফ থেকে এর কোন বর্ণনা পাওয়া  যায় না।

মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দেওয়ার কাজকে কোন নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ করা যায় না, বরং একজন ব্যাক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াতের কাজ করবেন, কোন দলকে নির্দিষ্ট না করে বা নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ না করে।

দাঈ ব্যাক্তিকে অবশ্যই  জ্ঞানী হতে হবে। অজ্ঞ ব্যাক্তির জন্য মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দেয়া জায়েজ নেই। আল্লাহ্‌ বলেন:

“হে নবী, আপনি বলে দিন, এটা আমার পথ। আর আমি আল্লাহর দিকে (একত্ববাদ) মানুষকে স্পষ্ট জ্ঞান নিয়েই দাওয়াত দেই।”

– সূরা ইউসুফ: সূরা – ১২: আয়াত – ১০৮

অর্থাৎ স্পষ্ট জ্ঞানের সাথে। দাওয়াত দানকারী ব্যাক্তির অবশ্যই, তিনি কার প্রতি দাওয়াত দিচ্ছেন, শরীয়তের বাধ্যতামূলক বিধান, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরুহ্ ইত্যাদি সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একইসাথে শিরক, পাপাচার, কুফর, অবাধ্যতা সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তাকে অবশ্যই খারাপ কাজের সমালোচনার বিভিন্ন ধাপ এবং কিভাবে তা করবে তা জানতে হবে। তাবলীগ জামাতের এ ধরনের ভ্রমনে বের হওয়ার পদ্ধতি ভুল যা মানুষকে জ্ঞানার্জনের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেননা ইসলামে জ্ঞানার্জন বাধ্যতামূলক। আর জ্ঞানার্জন সম্ভব কেবলমাত্র  শেখার মাধ্যমে, অনুপ্রেরণার মাধ্যমে নয়। এটি মূলত একটি ভ্রান্ত সূফি মতবাদ। কেননা জ্ঞান ছাড়া কর্ম হচ্ছে ভ্রান্তি, আর না শিখেই জ্ঞানার্জনের আশা মরীচিকা মাত্র।

সালাসা মুহাদারাত ফিল ইলম ওয়াদ দাওয়াহ গ্রন্থ থেকে নেওয়া।

এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন ।

             

মূল উৎসঃ Jamaa’at al-Tableegh – pros and cons

ফতোয়া প্রদানেঃ শাইখ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহু)

অনুবাদকঃ  সত্যান্বেষী  রিসার্চ  টীম

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

(Visited 2,811 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team