সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

তাশাহহুদে তর্জনী (শাহাদাত অঙ্গুলি) উঠানো

তাশাহহুদে তর্জনী (শাহাদাত আঙ্গুল) দিয়ে ইশারা করা যে সুন্নাত, এ বিষয়ে সকল আলেম একমত। সম্ভবত এর কারণ হল, এ বিষয়ের উপর যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো থেকে অন্তত এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন তাশাহহুদের জন্য বসতেন, তখন তাঁর তর্জনী উঠাতেন এবং এর দ্বারা ইশারা করতেন।

তাশাহহুদে তর্জনী দিয়ে ইশারা করার বিষয়ে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, এগুলো নির্দেশ করে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সর্বদা এটা করতেন। আর তাই এটি একটি সুস্পষ্ট এবং নিয়মিত পালনকৃত সুন্নাত। রাসূল (সাঃ) এর উপর আরও জোর দিয়েছেন যখন তিনি বলেনঃ

لهي أشد على الشيطان من الحديد يعني السبابة

এটি (শাহাদাত আঙ্গুল) শয়তানের জন্য লোহা অপেক্ষা অধিকতর ভারী এবং কঠিন। [মুসনাদে আহমাদ, ২/১১৯, হা/৬০০০ ; মুসনাদে বাযযার, হা/৫৯১৭ ; ত্বাবারাণী, আদ-দু’আ, হা/৬৪২ ; মিশকাত, হা/৯১৭, সানাদ হাসান]

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর উম্মাতকে তর্জনী দিয়ে ইশারা করার সওয়াব এবং এর হিকমত সম্পর্কে উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি এটি করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে আমাদেরকে শয়তানের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও কৌশল থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও বলে দিয়েছেন। এছাড়া এটি সালাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি একাগ্রচিত্ততা এবং পূর্ণ মনযোগের জন্য অপরিহার্য।

 

তর্জনী উঠানোর ধরণ নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবের ভিন্নতা

সকল আলেম অন্তত এই বিধানের উপর একমত যে, তাশাহহুদে তর্জনী উঠানো এবং তা দিয়ে ইশারা করা একটি প্রমাণিত সুন্নাত। কিন্তু এটি কোথায় এবং কীভাবে করতে হবে, সে ব্যাপারে আলেমগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন, যেমন এটি কি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার সাথে খাস (নির্দিষ্ট) নাকি আমরা তাশাহহুদের শুরু থেকে নিয়ে বৈঠকের শেষ পর্যন্ত এটি নাড়ানোর মাধ্যমে ইশারা করতে থাকবো?

হানাফী এবং শাফেঈ মাযহাবের মতে, এই আঙ্গুল উঠানো শুধুমাত্র ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার সাথে খাস (নির্দিষ্ট)। এই দুই মাযহাবের মাঝে একমাত্র পার্থক্য হল, হানাফীগণ ‘লা ইলাহা’ (কোন ইলাহ নেই) বলার সময় আঙ্গুল উঠান এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া) বলার সময় তা নামান। অন্যদিকে শাফেঈগণ বলেন, এটি শুধুমাত্র ‘ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় উঠাতে হবে।

মালেকীদের মতে, তাশাহহুদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তর্জনী ডানে-বামে নাড়াতে হবে। হাম্বলীদের মতে, আঙ্গুল দিয়ে তখনই ইশারা করতে হবে যখন তাশাহহুদে আল্লাহ’র নাম উচ্চারিত হবে, কিন্তু আঙ্গুল নাড়ানো ছাড়া। [ইসলাম প্রশ্ন ও উত্তর, ফা/৭৫৭০]

 

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর সাথে (খাস) নির্দিষ্ট করার দলীল এবং এর জবাব

তাশাহহুদে তর্জনী উঠানোকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অথবা শুধুমাত্র ‘আল্লাহ’ বলার সাথে খাস করার যে দলীল দেওয়া হয় তা নিছক তাদের ক্বিয়াসের উপর ভিত্তিশীল, যেমন যখন ‘লা ইলাহা ইল্লল্লাহ’ বলা হয় তখন বান্দা তার মুখ দিয়ে মহামান্বিত আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দেয়। অতএব এটাই শোভনীয় যে, সে তার অঙ্গুলি উঠিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দিবে তার কথা এবং কাজের মাধ্যমে। অপরদিকে হাম্বলীগণ বলেন, এর মাধ্যমে যদি মহান আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি প্রদান উদ্দেশ্য হয়, তবে আমাদের উচিত প্রত্যেক বার যখন ‘আল্লাহ’ শব্দ উচ্চারণ করা হবে তখন অঙ্গুলি উঠানো, যা নির্দেশ করবে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।

আমাদের জানা মতে, এরূপ খাস (নির্দিষ্ট) করার পক্ষে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কোন দলীল নেই। তবে হ্যাঁ, এর সমর্থনে মুসনাদ আহমাদ এবং সুনান বাইহাক্বীর একটি হাদীস পেশ করা হয় যেটি মারজূহ (অপ্রাধান্যযোগ্য) এবং অনির্ভরযোগ্য। ‘সুবুলুস সালাম’ গ্রন্থের লেখক আমীর সান’আনী বলেনঃ

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় তর্জনী উঠানোর আমলটি রাসূল (সাঃ) এর আমল, যেমনটি ইমাম বায়হাক্বী বর্ণনা করেছেন।

 

মাওলানা উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী ইমাম আস সান’আনীর খণ্ডনে বলেনঃ

قلت: حاصل ما رواه البيهقي وغيره في ذلك أنه – صلى الله عليه وسلم – كان يشير بالمسبحة إلى التوحيد، أو يريد بها التوحيد، أو يوحد بها ربه عز وجل، وليس فيه كما ترى تصريح بالإشارة عند قوله “لا إله إلا الله” خاصة. ولا نفي الإشارة قبل ذلك من ابتداء الجلوس. ومقصود الصحابي منه إنما هو بيان حكمة الإشارة ونكتتها، لا بيان محل الإشارة ووقتها

আমি বলিঃ যা ইমাম বায়হাক্বী এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন তা হল, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার মাধ্যমে তাওহীদ নির্দেশ করতেন অথবা বুঝাতেন এটা দ্বারা তাওহীদ উদ্দেশ্য অথবা তিনি এর দ্বারা তাঁর রবের তাওহীদ বর্ণনা করতেন। এতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় আঙ্গুল উঠানো অথবা বৈঠকের শুরু থেকে ইশারা করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা, কোনটিই নেই। এর দ্বারা সাহাবীর উদ্দেশ্য ছিল অঙ্গুলি ইশারা করার হিকমত বর্ণনা করা, এর ‘ধরণ’ বা ‘সময়’ বর্ণনা করা নয়। [মিরআতুল মাফাতীহ, ৩/২২৯]

 

তারজীহ (প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত)

যে কোন বিষয়ে আমাদের উচিত আলেমদের বিভিন্ন মতকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই মতকে প্রাধান্য দেওয়া যেটি নুসূস (কুরআন-হাদীস) এর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী। অতএব এ বিষয়ে কুরআন-হাদীস (নুসূস) থেকে প্রমাণিত সঠিক মত হল, মুসুল্লীর (সালাত আদায়রত ব্যাক্তির) উচিত তাশাহহুদের শুরু থেকে নিয়ে শেষ অবধি নিচের কাজগুলো করাঃ

০১. ডান হাতের অঙ্গুলিসমূহ দিয়ে একটি আংটির মত বানানো অথবা বৃদ্ধাঙ্গুলের সাথে মধ্যমাঙ্গুল যুক্ত করা (আংটির মত করে)।
০২. তর্জনী দিয়ে ইশারা করা এবং
০৩. তা অনবরত নাড়াতে থাকা।

যে নুসূস থেকে এটি প্রমাণিত তা নিচে উল্লেখ করা হলঃ

 
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا جَلَسَ فِي الصَّلاَةِ وَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى رُكْبَتَيْهِ وَرَفَعَ إِصْبَعَهُ الْيُمْنَى الَّتِي تَلِي الإِبْهَامَ فَدَعَا بِهَا وَيَدَهُ الْيُسْرَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُسْرَى بَاسِطُهَا عَلَيْهَا

ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন, যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাশাহহুদের জন্য বসতেন, তিনি তাঁর বাম হাতকে বাম হাঁটুর উপর এবং ডান হাতকে তাঁর ডান হাঁটুর উপর স্থাপন করতেন। আর তিনি তাঁর ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির পার্শ্ববর্তী (শাহাদত) আঙ্গুল উঠাতেন, এর মাধ্যমে দু’আ করতেন এবং তাঁর বাম হাতকে বাম হাঁটুর উপর ছড়িয়ে দিতেন। [মুসলিম, ১১৪/৫৮০, হা/১৩০৯ ; মিশকাত, হা/৯০৭]

 

অপর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا قَعَدَ فِي التَّشَهُّدِ وَضَعَ يَدَهُ الْيُسْرَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُسْرَى وَوَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى رُكْبَتِهِ الْيُمْنَى وَعَقَدَ ثَلاَثَةً وَخَمْسِينَ وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ

ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন, ‘যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাশাহহুদের জন্য বসতেন, তিনি তাঁর বাম হাতকে বাম হাঁটুর উপর এবং ডান হাতকে তাঁর ডান হাঁটুর উপর রাখতেন, আর তিনি (হাতের তালু এবং আঙ্গুলসমূহ গুটিয়ে আরবী) ৫৩ এর মত করে শাহাদত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন। [সহীহ মুসলিম, ১১৫/৫৮০, হা/১৩১০ ; মিশকাত, হা/৯০৬]

 

‘কানা ইযা ক্বয়াদা’ এবং ‘কানা ইযা জালাসা’ শব্দগুলো প্রমাণ করেঃ

০১. যখনই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাশাহহুদের জন্য বসতেন, তিনি তাঁর উভয় হাতকে হাঁটুর উপর রাখতেন এবং (কোন প্রকার দেরি না করেই) তর্জনী দিয়ে ইশারা করতেন।

 

০২. আর যেমনভাবে তাঁর হাত তাঁর হাঁটুর উপর তাশাহহুদের শেষ পর্যন্ত থাকতো, তর্জনী দিয়ে ইশারা করাও তেমনভাবে শেষ পর্যন্ত চলতো। বর্তমান যুগের মুহাদ্দিস শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহঃ) ইবনে উমার (রাঃ) এর প্রথম হাদীস সম্পর্কে বলেনঃ

‘এই হাদীস প্রমাণ করে (তাশাহহুদের জন্য) বসার সাথে সাথে আঙ্গুল উঠানো এবং এর দ্বারা ইশারা করা।’ [তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ লিল আলবানী, ১/২৮৫, হা/৯০৭]

 

ইবনে উমার (রাঃ) এর দ্বিতীয় হাদীস সম্পর্কে তিনি বলেনঃ

‘তাশাহহুদের দু’আ শেষ করে সালাম ফিরানোর পূর্ব পর্যন্ত এতে অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করার ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে।’ পুনরায় তিনি বলেন, ‘হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ শেষ সালাম পর্যন্ত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার দলীল।’ [তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ লিল আলবানী, ১/২৮৫, হা/৯০৬]

 

০৩. সাহাবী ওয়াইল বিন হুজর (রাঃ) এর একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ

(যখন তিনি (সাঃ) তাশাহহুদের জন্য বসলেন), তিনি তাঁর বাম হাতকে তাঁর বাম উরু ও হাঁটুর উপর রাখলেন এবং তাঁর ডান কনুইয়ের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ডান উরুর উপর স্থাপন করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর দুইটি আঙ্গুল ধরে গোল করলেন এবং সম্মুখ অঙ্গুলি (তর্জনী) উঠালেন। আর আমি দেখলাম, তিনি তা নাড়ছেন এবং এর মাধ্যমে দু’আ করছেন। [নাসাঈ, হা/৮৯০ ; ইরওয়াউল গালীল, ২/৮৬, হা/৩৬৭, সানাদ সাহীহ]

হাদীসের শব্দ فرأيته يحركها يدعو بها (ফা রআইতুহু উহাররিকুহা ইয়াদয়ু বিহা), অর্থাৎ ‘আর আমি দেখলাম, তিনি তা নাড়ছেন এবং এর মাধ্যমে দু’আ করছেন’ থেকে শাহাদত অঙ্গুলি ইশারা করা এবং নাড়ানোর ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল পাওয়া যায়।

ওয়াইল (রাঃ) এর উপরের হাদীস থেকে এটাও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার পাশাপাশি আমাদেরকে তা অনবরত নাড়ানো উচিত। অর্থাৎ আমাদের উচিত তাশাহহুদের শুরু থেকে সালাম এর পূর্ব পর্যন্ত আঙ্গুল নাড়াতে থাকা, কারণ এখানে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে (ইউহাররিকুহা) তা হল ফে’লে মুদারি‘, যা বিরামহীনতা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সমগ্র তাশাহহুদ ব্যাপী অনবরত অঙ্গুলি নাড়াতে থাকতেন। একই হাদীসের পরবর্তী শব্দ ‘ইয়াদয়ুবিহা’ এর অর্থ তিনি (সাঃ) অঙ্গুলি নাড়তে থাকার সাথে সাথে এসময় দু’আও করতেন। আর সমগ্র তাশাহহুদ হল দু’আর সমন্বয় – প্রথমে আত-তাহিয়্যাতের দু’আ, এরপর দরূদের দু’আ এবং অতঃপর অন্যান্য দু’আ। এজন্য ইবনে যুবাইর (রাঃ) এর নিচের হাদীসটিতে ‘তাশাহহুদ’ এর পরিবর্তে ‘দু’আ’ শব্দ এসেছে। বর্ণনাটি হলঃ

“যখন রাসূল (সাঃ) দু’আ করার জন্য বসতেন (অর্থাৎ তাশাহহুদ)…।” [সহীহ মুসলিম, ১১৩/৫৭৯, হা/১৩০৮ ; মিশকাত, হা/৯০৮]

এটা প্রমাণ করে, সমগ্র তাশাহহুদই দু’আ। তাই আমাদের উচিত সমগ্র তাশাহহুদ ব্যাপী আঙ্গুল নাড়ানো। শাইখ আলবানী (রাহঃ) বলেনঃ

হাদীসটি তাহরীক (বিরামহীন নড়াচড়া) এর সুযোগ করে দেয়, এটা মালেকীদের মাজহাব এবং এর উপরেই রয়েছে হক্ব।

 

০৪. আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَعَدَ يَدْعُو وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى فَخِذِهِ الْيُمْنَى وَيَدَهُ الْيُسْرَى عَلَى فَخِذِهِ الْيُسْرَى وَأَشَارَ بِإِصْبَعِهِ السَّبَّابَةِ وَوَضَعَ إِبْهَامَهُ عَلَى إِصْبَعِهِ الْوُسْطَى وَيُلْقِمُ كَفَّهُ الْيُسْرَى رُكْبَتَهُ

রাসূল (সাঃ) যখন দু’আ করার জন্য (তাশাহহুদের জন্য) বসতেন, তিনি তাঁর ডান হাতকে ডান উরু এবং বাম হাতকে তাঁর বাম উরুর উপর রাখতেন, শাহাদত অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করতেন, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলিকে মধ্যমার উপর রাখতেন এবং বাম হাতের তালু দ্বারা হাঁটুকে ঢেকে রাখতেন। [সহীহ মুসলিম, ১১৩/৫৭৯, হা/১৩০৮ ; মিশকাত, হা/৯০৮]

প্রথমে অঙ্গুলি ইশারা করা যে তাশাহহুদে বসার সময় থেকে শুরু এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় যে নয়, হাদীসটি এর আরও একটি প্রমাণ। মাওলানা উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেনঃ

হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ (তাশাহহুদে) বসার সময় থেকেই অঙ্গুলি ইশারা করার দাবি রাখে। আর আমি এমন একটি হাদীসও পাইনি যা প্রমাণ করে এই ইশারা করা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাথে খাস।

পুনরায় তিনি বলেনঃ

আমাদের নিকট প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হল, ৫৩ এর মত করে আংটি বানিয়ে শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা এবং সালামের পূর্ব পর্যন্ত তা করা।

 

একটি আপত্তি এবং এর জবাব

শাইখ মোল্লা আলী ক্বারী সহ কিছু আলেম বলেন, ওয়াইল বিন হুজর (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণিত ‘ফা রআইতুহু ইউহাররিকুহা ইয়াদয়ু বিহা’ শব্দগুলো আব্দুল্লাহ বিন জুবায়ের (রাঃ) এর হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক যেখানে বলা হয়েছেঃ

“যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাশাহহুদের জন্য বসতেন, তিনি দু’আ করার সময় আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করতেন কিন্তু তা নাড়তেন না।” [আবু দাউদ, হা/৯৮৯ ; নাসাঈ, হা/১২৭১, সানাদ দ্বাঈফ]

 

জবাবঃ
শাইখ আলবানী (রাহঃ) বলেন, যদিও হাদীসটি ‘হাসান’ স্তরের, কিন্তু ২টি কারণে এই বৈপরীত্য মারজূহঃ

০১. ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এর হাদীস অপেক্ষা ওয়াইল (রাঃ) এর হাদীস অধিকতর সহীহ। ‘তারজীহ’ এর মূলনীতি অনুযায়ী, যখন আপাতদৃষ্ট ২টি হাদীসের মাঝে সমন্বয়সাধন সম্ভব হয় না, তখন তাদের একটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এসব মূলনীতির মাঝে একটি হল, একটি হাদীস অপর একটি হাদীসের চেয়ে অধিক সহীহ হলে অধিকতর সহীহ হাদীসটি প্রাধান্য পাবে।

০২. ওয়াইল (রাঃ) এর হাদীসটি হল মুসবাত (প্রতিষ্ঠিত কর্ম), অপরদিকে ইবনে যুবায়ের (রাঃ) এর হাদীসটি নাফি (নিষেধসূচক কর্ম। আর প্রসিদ্ধ মূলনীতি অনুযায়ী, মুসবাত হাদীস নাফি হাদীসের উপর প্রাধান্য পাবে। অধিকন্তু, হাদীসের শব্দ ‘ওয়া লা ইউহাররিকুহা’ (আর তিনি নাড়তেন না) হল শায অথবা মুনকার (অস্বীকৃত), কারণ মুহাম্মদ বিন আজলান এই শব্দগুলোকে কিছু বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন কিন্তু অন্য বর্ণনাগুলোতে উল্লেখ করেন নি। তাই যে রাবী (হাদীস বর্ণনাকারী) উপরোল্লেখিত শব্দসমূহের মুতাবা’আহ (অনুসরণ) করেছে, সে নিজেও একজন মুতাবি‘ (সেগুলোর অনুসারী)।

এই ছিল শাইখ আলবানী কর্তৃক উল্লেখিত হাদীসটির ২ ধরনের দুর্বলতা। তাছাড়া, মুহাম্মদ বিন আজলান একজন মুদাল্লিস (উস্তাদের নাম গোপন রেখে হাদীস বর্ণনাকারী) হিসেবেও প্রমাণিত।
 
হাফিয ইবনে হাজার আস্কালানী (রাহঃ) তার মুদাল্লিসীনদের ব্যাপারে লিখিত গ্রন্থে ইবনে আজলান কে ৩য় স্তরের মুদাল্লিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন (যার ‘আন’ শব্দে বর্ণিত হাদীস দ্বাঈফ হওয়ার কারণ), আর এতে তিনি বলেন, ‘ইবনে হিব্বান তাকে মুদাল্লিস বলেছেন।’ [তাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, ৩/৯৮ ; আল ফাতহুল মুবীন, পৃ/১১৭]
 
এছাড়া আল্লামা হালাবী ‘আত-তাবেঈন’ গ্রন্থে তাকে মুদাল্লিস বলেছেন। আর তিনি হাফিয ‘আলাবী থেকে বর্ণনা করে বলেনঃ

‘তিনি (‘আলাবী) ইবনে আবী হাতিম থেকে বর্ণনা করেন, সে ছিল একজন মুদাল্লিস।’ [জামিউল তাহসীল, পৃ/১২৫]
 
তাকে আরও মুদাল্লিস বলেছেন আবু মাহমুদ মাক্বদেসী, যাহাবী এবং যামিনী। হাফিয সুয়ূতী তাকে ‘আসমা মান আরাফা বিত তাদলীস’ (তাদের নাম যারা তাদলীসকারী হিসেবে পরিচিত) নামক রিসালায় উল্লেখ করেছেন। [দেখুন শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ এর ‘ফাতহুল মুবীন ফী তাহক্বীক্ব তাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন’]
 
অধিকন্তু, হানাফীদের মধ্যে সম্মানিত আলেম আল্লামা তাহাবী (রাহঃ)ও তাকে মুদাল্লিস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। [মুশকিলুল আসার, ১/১০০-১০১]
 
আল্লামা সিন্ধী হানাফী (রাহঃ)ও ‘হাশিয়া ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে তাকে মুদাল্লিস বলেছেন। শাইখ আলবানীর বক্তব্যঃ

আমি জানি না ইবনে আজলানকে কেউ মুদাল্লিস বলেছে কিনা। [ইরওয়াউল গালীল, ৭/৩৬৩, হা/২৩২৭]

এ বক্তব্যটি সঠিক নয়, যেহেতু আমরা উপরে প্রমাণ করেছি যে তিনি একজন মুদাল্লিস। তাছাড়া হাদীসটি ‘আন’ শব্দে বর্ণিত হয়েছে, তাই এটি সহীহ নয় এবং এ থেকে দলীল নেওয়াও সঠিক নয়। তাই ইমাম আলবানী কর্তৃক হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলাটাও সঠিক নয়।

এভাবে হাদীসটি সনদ এবং মতন উভয় দিক থেকেই দুর্বল। এজন্য এটি ওয়াইল (রাঃ) এর হাদীস বিরোধী হতে পারে না। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।

 

আরও একটি আপত্তি এবং তার জবাব

কিছু লোক ভুল করে বলে থাকে, হাদীসের বক্তব্য ‘আঙ্গুল নাড়ানো’ এবং ‘আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা’ পরষ্পর বিরোধী।

জবাবঃ
আঙ্গুল নাড়ানো কোনভাবেই আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার বিরোধী নয়, বরং এটি ইশারা করার সাথে একটি অতিরিক্ত কাজ। আর দ্বিতীয় কাজটি করা প্রথম কাজটির বাতিল হওয়াকে আবশ্যক করে না কারণ উভয় কাজ একই সময়ে করা হয়। এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে কোন কিছু নাড়ানো এবং ইশারা একই সাথে করা হয়, যেমন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা দেখে থাকি, কোন ব্যক্তি তার থেকে দূরে দাঁড়ানো কোন বন্ধুকে ডাকার সময় হাত উঠায়, এটা হল ‘ইশারা করা’। এছাড়া সে তার আঙ্গুলও নাড়ায়, এটা হল ‘নাড়ানো’।

আমরা তাহলে জানলাম আঙ্গুল ইশারা করা এবং নাড়ানো একটি অপরটির বিপরীত নয়, বরং উভয় কাজের উপর একই সময়ে আমল করা সম্ভব। আর হাদীস থেকেও উভয় আমল সাব্যস্ত হয়। কাজেই আমরা উভয় আমল করবো। তাই যারা তাশাহহুদে তাদের অঙ্গুলি নাড়ায়, তারা উভয়টির উপর আমল করে। এটা বলা সঠিক নয়য় যে, যারা আঙ্গুল নাড়ায় তারা ইশারা করে না, কারণ ইশারা করা ছাড়াই প্রথমে আঙ্গুল নাড়ানো অসম্ভব। সেজন্য ‘আহলে তাওহীদ’ উভয়টির উপর আমল করে থাকে কেননা সেগুলো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

একারণে ইমাম নাসাঈ (রাহঃ) [যিনি আলোচ্য বিষয়ে হাদীস বর্ণনা করেছেন] তার সুনান গ্রন্থের অন্যত্র একই সাথে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা এবং নাড়ানো বিষয়ে একটি অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন। অধ্যায়টির নামঃ

باب مَوْضِعِ الْبَصَرِ عِنْدَ الإِشَارَةِ وَتَحْرِيكِ السَّبَّابَةِ

অর্থঃ শাহাদত অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করা এবং নাড়ানোর সময় কোথায় দৃষ্টি রাখতে হবে। [নাসাঈ, কিতাবুস সাহু, অধ্যায়: নং ৩৯, হা/১২৭৫]

 

আর ইমাম আহমাদ (রাহঃ) এরও সিদ্ধান্ত হল, তাশাহহুদে ইশারা এবং নাড়ানো উভয়টি একসাথে করতে হবে। ইমাম আহমাদ কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘শাদীদান – অঙ্গুলি দিয়ে  তীব্রভাবে ইশারা কর’, আর তীব্রভাবে  ইশারা তখনই করা হবে যখন আমরা একে নাড়াবোও। [মাসায়েল ইবনে হানি, ১/৮০]

মহান আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করুন এবং রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাত অনুসরণ করার সামর্থ্য দান করুন। আমীন!

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ
০১. নাইলুল আওতার (২/২৮৩)
০২. সাইয়্যেদ সাবেক এর ফিক্বহুস সুন্নাহ (১/১৭০)
০৩. যাদুল মা’আদ (১/২৫৫)
০৪. আলবানীর তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাসাবীহ (১/২৮৫)
০৫. শাইখ উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরীর মিরআতুল মাফাতীহ (১/৬৬১-৬৭২)

 

সংকলনঃ আব্দুল্লাহ আল বাকিস্তানী

অনুবাদকঃ নাজমুস সাকিব

পরিবেশনায়ঃ সত্যান্বেষী রিসার্চ টীম
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না। 
 

(Visited 407 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team