সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

মিরাজের রাত্রিতে মুহাম্মাদ (সা) জুতা পায়ে দিয়ে আরশ বা তাঁর ঊর্ধ্বে গিয়েছিলেন কি?

সর্বপ্রথম মি’রাজ সম্পর্কে আমরা আমাদের অবস্থান পরিস্কার করছি। আমরা বিশ্বাস করি, মি’রাজ রাসুল (সাঃ)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জেজা। রাসুল (সাঃ)-কে মহান আল্লাহ তায়ালা সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে নিয়ে গিয়েছেন। আমরা মি’রাজ সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত প্রত্যেকটা বক্তব্য বিনা বাক্য ব্যায়ে, বিনা যুক্তিতে ঈমান রাখি।

 

আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মি’রাজ সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করি। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) যেখানে থেমে গেছেন, আমরাও সেখানে থেমে যাই। নিজেদের পক্ষ থেকে কল্পনার ঘোড়া ছুটাই না। এবং বিশুদ্ধ বর্ণনা ছাড়া কাল্পনিক কোন কিছু বর্ণনা করাকে চরম গর্হিত কাজ বলে মনে করি। আশা করি সম্মানিত পাঠকদের কাছে সংক্ষিপ্তভাবে মি’রাজ সম্পর্কে আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।

 

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে মি’রাজকে কেন্দ্র করে অসংখ্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বক্তব্যের ছড়াছড়ি রয়েছে। অনেক বই পুস্তকে এসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। আর কিছু ওয়ায়েজিন সম্ভবত অজ্ঞতা বশত অথবা শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার আশায় এই সমস্ত বানোয়াট কিসসা কাহিনী বর্ণনা করে শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন। এরকম অসংখ্য অগনিত বানোয়াট কাহিনীর মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনী হচ্ছে, মি’রাজে জুতা পায়ে দিয়ে আরশে গমন (নাউযুবিল্লাহ)

 

মি’রাজের রাত্রিতে নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) আরশ বা তাঁর ঊর্ধ্বে গিয়েছিলেন কিনা?

 

সমাজে অতি প্রসিদ্ধ কথা প্রচলিত আছে যে, মি’রাজের রাত্রিতে রাসুল (সাঃ) আরশে আরোহণ করেছিলেন! কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট একটি কথা। মি’রাজের ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় অর্ধশত সাহাবী (রাঃ) থেকে মি’রাজের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ আছে প্রায় সকল প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে। কুরআন ও এই সমস্ত হাদীসে রাসুল (সাঃ)-এর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পর্যন্ত গমনের কথা জানা যায়। তিনি ‘সিদরাতুল মুনতাহার’ ঊর্ধ্বে বা আরশে গমন করেছেন বলে এমন কোন হাদীসের বর্ণনা পাওয়া যায় না।

 

মুহাম্মাদ ইবন আবদুল বাকী যারকানী (১১২২ হিজরি) ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ‘শারহুল মাওয়াহিব’ গ্রন্থে রাযী কাযবীনীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেনঃ

 

“কোনো একটি সহীহ, হাসান অথবা যইফ হাদীসেও বর্ণিত হয়নি যে, রাসুল (সাঃ) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ অতিক্রম করেছিলেন। বরং বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তথায় এমন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন যে, কলমের খসখস শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। যিনি দাবী করবেন যে, রাসুল (সাঃ) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ অতিক্রম করেছিলেন তাকে তার দাবীর স্বপক্ষে প্রমান পেশ করতে হবে। তবে কিভাবে তিনি তা (প্রমান) করবেন! একটি সহীহ অথবা যইফ হাদীসেও বর্ণিত হয়নি যে, তিনি আরশে আরোহণ করেছেন। অতএব এই বিষয়ে কারো কারো মিথ্যাচারের প্রতি দৃষ্টিপাত নিষ্প্রয়োজন।’’

– যারকানী, শারহুল মাওয়াহিব ৮/২২৩

 

মি’রাজে জুতা পায়ে দিয়ে আরশে গমন প্রসঙ্গে আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি জাল হাদীসঃ

 

“মি’রাজের রাত্রিতে যখন রাসুল (সাঃ)-কে উচ্চতম আকাশমণ্ডলীতে নিয়ে যাওয়া হল এবং আরশে মুয়াল্লায় পৌঁছালেন, তখন তিনি তাঁর পাদুকাদ্বয় খোলার ইচ্ছা করলেন। কারন আল্লাহ তায়ালা মুসা (আঃ)-কে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার পাদুকা খোল; তুমি পবিত্র তুয়া প্রান্তরে রয়েছ’ (ত্ব-হা ২০/১২)। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হল, হে মুহাম্মাদ! আপনি আপনার পাদুকাদ্বয় খুলবেন না। কারন আপনার পাদুকাসহ আগমনে আরশ সৌভাগ্যমণ্ডিত হবে এবং অন্যদের উপরে বরকতের অহংকার করবে। তখন রাসুল (সাঃ) পাদুকাদ্বয় পায়ে রেখেই আরশে আরোহণ করেন’’ (নাউজুবিল্লাহ)

 

এ কাহিনীর আগাগোড়া সবটুকুই মিথ্যা ও বানোয়াট। হাদীস বিশেষজ্ঞগণ এ কাহিনী সম্পর্কে বরাবরই বলে আসছেন যে, এ কাহিনী মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। প্রায় অর্ধশত সাহাবী থেকে মি’রাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে রাসুল (সাঃ)-এর মি’রাজ তথা ঊর্ধ্বজগতে গমনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এঁদের কারো হাদীসে একথা উল্লেখ নেই যে, সে রাতে তাঁর পায়ে জুতা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের অনেক সুপরিচিত আলেম ও মুহাদ্দিসগন(!) এ সকল মিথ্যা কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর নামে নির্বিচারে প্রচার করেন এবং ওয়ায মাহফিলের আসর গরম করে থাকেন। আর সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ধোঁকা দিয়ে থাকেন।

 

যাই হোক, আমরা আমাদের বক্তব্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাযিউদ্দিন কাযবীনী, আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-মাক্কারি, যারকানী, দরবেশ হুত, আবদুল হাই লাখনবী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ কাহিনীর জালিয়াতি ও মিথ্যাচার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ইমাম রাযীউদ্দিন কাযবীনী-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) জুতা নিয়ে আরশে গমন এবং আল্লাহ তায়ালার সম্বোধন, হে মুহাম্মাদ! আপনার জুতায় আরশ ধন্য হয়েছে, ইত্যাদি প্রমানিতি কিনা? জবাবে তিনি বলেছেনঃ

 

“জুতা পায়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরশে গমনের হাদীস প্রমানিত নয়। এমনকি (খালি পায়ে) আরশে পৌঁছেছেন, এমন কথাও কোনো নির্ভরযোগ্য সুত্রে বর্ণিত নেই। সহীহ বর্ণনা মতে, তিনি শুধু সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন করেছেন।’’

– সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ- শারহুল মাওয়াহেব ৮/২২৩

 

আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ মাক্কারী তাঁর ‘ফাতহুল মুতআল ফী খাইরিন নিআল’ গ্রন্থে উল্লেখিত বক্তব্যটিকে জাল বলেছেন। আল-আসারুল মারফুআ, পৃষ্ঠা নঃ ৩৭

 

সেই বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা আমাদের বক্তব্য শেষ করছি আবদুল হাই লাখনবীর একটি বক্তব্য দিয়ে, তিনি বলেনঃ

 

“এ ঘটনা যে জালিয়াত বানিয়েছে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করুন। রাসুল (সাঃ) মি’রাজের ঘটনায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অনেক বেশি। এতগুলো হাদিসের মধ্যে একটি হাদীসেও বর্ণিত হয়নি যে, রাসুল (সাঃ) মি’রাজের সময় পাদুকা পরে ছিলেন। এমনকি এ কথাও প্রমানিত হয়নি যে, রাসুল (সাঃ) আরশে আরোহণ করেছিলেন।’’

– আবদুল হাই লাখনবী, আল-আসারুল মারফুয়া ফিল আখবারিল মাওযুয়া; পৃষ্ঠা নঃ ৩৭

 

শেষ কথাঃ

আমরা আমাদের সাধ্যমতো দলীল প্রমান উপস্থাপন করার চেষ্টা করলাম। এর মধ্যে কল্যাণকর যা কিছু আছে তা আল্লাহর পক্ষ হতে। আর ভুলত্রুটি আমার ও শয়তানের পক্ষ হতে। অতঃপর বলতে চাই আমাদের বক্তব্যে কোনো ভুল থেকে থাকলে তা যথাযথ দলীল প্রমান সহ উল্লেখ করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

 

সহায়ক গ্রন্থঃ

০১) হাদীসের নামে জালিয়াতি, আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির, পৃষ্ঠা নঃ ৩৫০-৩৫৩

০২) প্রচলিত জাল হাদীস, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, পৃষ্ঠা নঃ ১৮২-১৮৪

০৩) ইসরা ও মি’রাজ, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ও মাওলানা মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান, গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার; গবেষণাপত্র-৩; পৃষ্ঠা নঃ ৫৪-৫৫

 

সংকলনঃ সত্যান্বেষী রিসার্চ টীম
পরিবেশনায়ঃ সত্যান্বেষী রিসার্চ টীম
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না। 
(Visited 185 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team