সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

ইমাম বুখারীর কিতাবসমূহের বিভ্রান্তি নিরসন

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

বর্তমানে কিছু কিছু ভাই ইসলামের কিছু মাস’আলা নিয়ে অনেক কিছু লেখালেখি করছেন। কোন কিছু বলার বা লেখার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু ইসলামিক কিছু লিখতে হলে অনেক যাচাই করে লেখা উচিত। কেননা আপনি যদি কোন ভুল করেন সেই দায়ভার শুধু আপনাকেই নিতে হবে। এমনকি অন্যান্যদের ঐ ভুলের কারণে কৃত গুণাহের সমপরিমাণ গুণাহ আপনারও হবে। তাই এই বিষয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম। ভুল হলে সুন্দর করে আমাকে ধরিয়ে দিবেন। আমি ইনশাআল্লাহ আমার ভুল থেকে সঠিক পথে আসবো।

প্রথমেই ইমাম বুখারীর কিতাবগুলোর অবস্থা বর্ণনা করি। তাদের মতে ইমাম বুখারীর কিতাবগুলো সানাদের দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ। ইমাম বুখারীর জুযউ রফউল ইয়াদাঈন, জুযউল ক্বিরা’আত, কিতাবুয যু’আফা আছ-ছগীর এই কিতাবগুলো প্রমাণিত নয় এরকম একটি ধারণা তারা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই কিতাবগুলো ইমাম বুখারী থেকে প্রমাণিত। আলহামদুলিল্লাহ

কিতাবুয যু’আফা আছ-ছগীরঃ

মূলত এই কিতাবে ইমাম আবু হানীফার ব্যাপারে সমালোচনা রয়েছে যেই কারণে তারা এই কিতাবকে ভুল প্রমাণিত করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা মনে হয় জানেন না যে, এই সমালোচনাগুলো অন্যান্য কিতাবে একই অথবা ভিন্ন সানাদে বর্ণিত রয়েছে। তাই এই কিতাবকে ভুল প্রমাণিত করেও কোন লাভ নেই।

১ম রাবীঃ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন। ইনি মাজহূল। কিন্তু ইনি ৫০০ হিজরির পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার অনেক আগেই ইমাম আবু নুআইম আছবাহানী ও ইমাম উক্বাইলী তাদের কিতাবে ইমাম বুখারী থেকে সানাদ সহ সমালোচনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ এর মাজহূল হওয়ার জন্য এই কিতাবকে বাত্বিল বলা খুবই হাস্যকর। এছাড়াও ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী অন্য একটি সানাদে এই কিতাব বর্ণনা করেছেন যেখানে উক্ত রাবী নেই। (ইবনে হাজার আসক্বালানী, মু’জামুল মুফাহরাস, পৃঃ ১৭৩, কিতাব নং ৬৭৬)

২য় রাবীঃ আদাম ইবনে মূসা।

আদাম ইবনে মূসা থেকে একাধিক ছিক্বাহ রাবী বর্ণনা করেছেন।

১। ইমাম ইবনে হিব্বান। (ইবনে হিব্বান, হা/৫৯৩৪)

২। ইমাম উক্বাইলী। ইনি প্রায় ইমাম বুখারীর কিতাবুয যু’আফা আছ-ছগীর এর ৯৫% রাবীর ক্ষেত্রে (প্রায় ৪০০ এর মত) আদাম ইবনে মূসার মাধ্যমে ইমাম বুখারীর সমালোচনাগুলো উল্লেখ করেছেন। এমনকি অনেক রাবীকে তিনি দুর্বল বলেছেন শুধু ইমাম বুখারীর সমালোচনার মাধ্যমে। অর্থাৎ তার নিকট আদাম ইবনে মূসা যদি ছিক্বাহ নাই হতেন তবে তিনি ইমাম বুখারীর সমালোচনার ভিত্তিতে কোন রাবীকে দুর্বল বলতেন না। (উক্বাইলী, যু’আফা আল-কাবীর, রাবী নং ৫, ৯, ১৯, ২৩, ৩০ ইত্যাদি)

৩। ইমাম আবু বাকর ইসমাঈলী। (আবু বাকর ইসমাঈলী, আল মু’জামু ফী আসামা শুয়ুখু আবু বাকর ইসমাঈলী, হা/২১১) [যদিও এখানে আদাম ইবনে আলী আছে কিন্তু সঠিক নাম হবে আদাম ইবনে মূসা]

ইমাম ইবনে হিব্বান তার “ছহীহ” তে (হা/৫৯৩৪) আদাম ইবনে মূসার হাদীছটি এনেছেন। অর্থাৎ, তার নিকট এই হাদীছটি ছহীহ এবং এর রাবীগণ ছিক্বাহ।

ইমাম আবু নুআইম আছবাহানী আদাম ইবনে মূসার মাধ্যমে ইমাম বুখারীর সমালোচনাগুলো বর্ণনা করেছেন এবং তা দিয়ে দলীল দিয়েছেন। (আবু নুআইম আছবাহানী, আল-মুসনাদ আল-মুসতাখরাজ আ’লা ছহীহ মুসলিম, ১/৮৮)

এছাড়াও আপনাদের উছূল অনুযায়ী দুই জন ছিক্বাহ রাবী যখন কোন রাবী থেকে বর্ণনা করে, তখন তার আদালাত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আর এখানে তো একাধিক ছিক্বাহ ইমাম বর্ণনা করেছেন। তো আপনারা কিভাবে মাজহূল বলেন আদাম ইবনে মূসাকে?

এই উছূলটি ভুল তা ইনশাআল্লাহ পরে উল্লেখ করবো। এমনকি বর্তমানেরও কোন মুহাদ্দিছ যেমন শাইখ নাছিরুদ্দীন আলবানী, শাইখ শু’আইব আরনাউত্ব, শাইখ যুবাইর আলী যাঈ, শাইখ হুসাইন সালিম আসাদ দারানী, শাইখ বাশশার আওওয়াদ মা’রুফ ও শাইখ ইরশাদুল হক্ব আছারী প্রমুখগণ এই উছূল মেনে হাদীছ তাহক্বীক্ব করেন নি। আলহামদুলিল্লাহ

আদাম ইবনে মূসাকে ইমাম ইবনে হিব্বান ও ইমাম আবু নুআইম আছবাহানী তাওছীক্ব করেছেন যার জন্য তিনি কমপক্ষে সত্যবাদী ও হাসানুল হাদীছ। আলহামদুলিল্লাহ

সুতরাং, ইমাম বুখারীর উক্ত কিতাবটি কোনভাবেই বাত্বিল নয়। আলহামদুলিল্লাহ

জুযউ রফউল ইয়াদাঈন ও জুযউল ক্বিরা’আতঃ

এই দুইটি কিতাবকে বাত্বিল বলার চেষ্টা করা হয় কেননা হানাফী মাযহাব মতে ছলাতে রফউল ইয়াদাঈন করা ও ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা ক্বিরা’আত করা উচিত নয়। যদি এই কিতাবদ্বয় বাত্বিলও হয়ে যায় তাও ছলাতে রফউল ইয়াদাঈন করা ও ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা ক্বিরা’আত করা অন্যান্য কিতাব দ্বারা প্রমাণিত। আলহামদুলিল্লাহ

এই কিতাব দুইটির প্রধান রাবী হলেন মাহমুদ ইবনে ইসহাক্ব।

মাহমুদ ইবনে ইসহাক্ব থেকে একাধিক ছিক্বাহ রাবী বর্ণনা করেছেন।

১। আবু নাছর মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মূসা আল-মালাহিমী। (যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/৮৬, রাবী নং ৫২)

২। আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন। (খত্বীব আল-বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ৬/১২২, রাবী নং ২৬০৫; আবু ইয়া’লা খলীলী, আল-ইরশাদ, ৩/৯৭৪, রাবী নং ৯০৩ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

৩। আবুল ফাদ্বল আহমাদ ইবনে আলী ইবনে আমর আল-বুখারী। (যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায, ৩/১৬০, রাবী নং ৯৬০)

ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন এবং দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। (যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ৭/৬৬৫, রাবী নং ৮৩)

ইমাম আবু ইয়া’লা খলীলী বলেন, (ইমাম বুখারীর) বুখারাতে থাকার শেষ পর্যায়ে মাহমুদ (ইমাম) বুখারী থেকে “আজযা” বর্ণনা করেন। মাহমুদ ৩৩২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (আবু ইয়া’লা খলীলী, আল-ইরশাদ, ৩/৯৬৮, রাবী নং ৮৯৫ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী তার একটি হাদীছকে হাসান বলেছেন। (ইবনে হাজার আসক্বালানী, মুওয়াফাক্বাতুল খবর, ১/৪১৭)

(পূর্ববর্তী অর্থাৎ বর্তমানের কেউ নয়) মুহাদ্দিছগণ যদি কোন হাদীছকে ছহীহ বা হাসান বলেন, তবে সেটি ঐ হাদীছটির রাবীগণেরও তাওছীক্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (যাইলাঈ, নাছবুর রাইয়াহ, ১/১৪৯)

কিছু ভাই শাইখ যুবাইর আলী যাঈ কে রাদ্দ করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা শাইখের অনেক উছূল না বুঝেই তাকে নিয়ে বিদ্রূপ মন্তব্য করেন। তিনি ভুলের উর্দ্ধে নন। কিন্তু যদি জোর করে ভুল প্রমাণ করতে কেউ চেষ্টা করে থাকেন তখন কিছু আর বলার থাকে না। যাই হোক এখানে তার একটি উছূল উল্লেখ করে রাদ্দ করা হয়। সেটি হল – “মুহাদ্দিছগণ যদি কোন মুনফারিদ রাবীর হাদীছকে ছহীহ বা হাসান বলেন, তবে সেটি ঐ হাদীছটির রাবীগণেরও তাওছীক্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।” এই ক্ষেত্রে আমার মনে হয় তারা ইমাম তিরমিযীর “আস-সুনান” কেউ পড়ে দেখেন নি। ইমাম তিরমিযী তার সুনানে অসংখ্য জায়গায় উল্লেখ করেছেন যে, অমুক রাবীর (ছাহাবীর) হাদীছ হাসান, অমুক রাবীর (ছাহাবীর) হাদীছ ছহীহ। কিন্তু তিনি এর সাথে এটিও উল্লেখ করেছেন যে অন্যান্য রাবীরা (ছাহাবীরা) এটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু শুধু একক ভাবে তার সুনানে উল্লেখিত হাদীছের রাবীর (ছাহাবীর) কথা বলেছেন যে তার হাদীছ হাসান অথবা ছহীহ। একজন অল্প জ্ঞানী ব্যক্তিও এটি পড়ে বুঝার কথা আর আপনারা তো অনেক বড় মাপের আ’লিম!!!

যাই হোক মাহমুদ ইবনে ইসহাক্ব এর হাদীছ ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী হাসান বলেছেন। তিনি যদি অন্য শাওয়াহিদের জন্য হাসান বলতেন তবে তার থেকে ইমাম বুখারী পর্যন্ত মাহমুদের মাধ্যমে সানাদ বর্ণনা করতেন না। তিনি সরাসরি অন্যান্য তাখরীজের কথা উল্লেখ করে হাদীছের মান বলে দিতেন। একটু ভালো করে চিন্তা করলে এটুকু বুঝতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং, জুযউ রফউল ইয়াদাঈন ও জুযউল ক্বিরা’আত কিতাব দুইটি ইমাম বুখারী থেকে প্রমাণিত। আলহামদুলিল্লাহ

তারীখু ইবনে মাঈন – বর্ণনায় ইবনে মুহরিযঃ

এই কিতাবের প্রধান রাবী হচ্ছেন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল ক্বাসিম ইবনে মুহরিয। কিন্তু ইনি মাজহূল। কারণ তার ব্যাপারে জারাহ ও তা’দীল কোন কিছুই জানা যায় না।

ইবনে মুহরিয থেকে এক জন রাবী বর্ণনা করেছেন।

১। আবুল ফাদ্বল জা’ফার ইবনে দাস্তুরিয়্যাহ ইবনুল মারযুবান। ইনি ইবনে মুহরিয থেকে উক্ত কিতাবটি বর্ণনা করেছেন। (ইবনে মুহরিয, তারীখু ইবনে মাঈন, পৃঃ ৫০)

কিন্তু ইনিও মাজহূল। কারণ তার ব্যাপারে জারাহ ও তা’দীল কোন কিছুই জানা যায় না।

ইবনে মুহরিয থেকে আরো কেউ বর্ণনা করেছেন কিনা তা আমাদের জানা নেই। যদি কেউ জেনে থাকেন তবে দলীলসহ জানাবেন।

এছাড়াও আপনাদের উছূল অনুযায়ী দুই জন ছিক্বাহ রাবী যখন কোন রাবী থেকে বর্ণনা করে, তখন তার আদালাত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু এখানে ছিক্বাহ রাবী তো নেই বরং আছে মাজহূল রাবী। আপনাদের উছূল অনুযায়ীও ইবনে মুহরিয ছিক্বাহ প্রমাণিত নন।

সুতরাং, এই কিতাবটি ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন থেকে প্রমাণিত নয়। আলহামদুলিল্লাহ

তাই আমাদের সকলের উচিত তাক্বলীদ মুক্ত হয়ে ক্বুর’আন ও ছহীহ হাদীছ দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করা এবং মেনে চলা। আল্লাহ আমাদের সকলকে হিদায়াত দান করুক। আমীন

(Visited 450 times, 1 visits today)

Follow me!

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team