সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

“গাযওয়াতুল হিন্দ” সম্পর্কিত হাদীসসমূহের তাহক্বীক

 

গাযওয়াতুল হিন্দ একটি অতিপরিচিত নাম। নামটা অতিপরিচিত হলেও এর ব্যাপারে সঠিক ধারণা ও বিশ্বাস অতি অপরিচিত। অধিকাংশের অকাট্য বিশ্বাস যে, এই গাযওয়াতুল হিন্দ ঈসা (আঃ) এর যুগে সংঘঠিত হবে। একে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির লোক জনসাধারণকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে বিভ্রান্তির দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এই প্রবন্ধে এ নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশা আল্লাহ।

 

১ম হাদীস:

 

عَنْ ثَوْبَانَ ، مَوْلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : «عِصَابَتَانِ مِنْ أُمَّتِي أَحْرَزَهُمَا اللهُ مِنَ النَّارِ : عِصَابَةٌ تَغْزُو الْهِنْدَ ، وَعِصَابَةٌ تَكُونُ مَعَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ، عَلَيْهِمَا السَّلاَمُ»

 

সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আমার উম্মাহর দু’টি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন: একদল হল, যারা হিন্দে যুদ্ধ করবে, অপরদল হল, যারা ঈসা বিন মারয়াম (আঃ) এর সাথে থাকবে। [মুসনাদে আহমাদ হা/২২৪৪৯; নাসায়ী, হা/৩১৭৫; বাইহাকী ‘আল-কুবরা’, হা/১৮৩৮১; ইত্যাদি]

 

এই হাদীসকে আল্লামা আলবানী সহীহ বলেছেন। শাইখ শোয়াইব আরনাঊত, শাইখ যুবাইর আলী যাঈ ও ইয়াসির হাসান ‘হাসান’ বলেছেন। এই হাদীস কমপক্ষে হাসান ইনশাআল্লাহ ।

 

২য় হাদীস:

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضِيَ الله عنْهُ ، قَالَ : “وَعَدَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَزْوَةَ الْهِنْدِ فَإِنْ أَدْرَكْتُهَا أُنْفِقْ فِيهَا نَفْسِى وَمَالِى وَإِنْ قُتِلْتُ كُنْتُ أَفْضَلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ رَجَعْتُ فَأَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ الْمُحَرَّرُ”

 

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে গাযওয়াতুল হিন্দের অঙ্গীকার করেছেন। আমি তা পেলে তাতে আমার জান ও মাল উৎসর্গ করে দিব। যদি শহীদ হয়ে যাই, তবে আমি উত্তম শহীদ হব, আর যদি ফিরে আসি, তবে আমি আবু হুরাইরাহ (জাহান্নাম থেকে) মুক্ত। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২১২৮; নাসায়ী, হা/৩১৭৩]

 

আল্লামা আলবানী, শাইখ শোয়াইব আরনাঊত, শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ ও শাইখ ইয়াসির হাসান এই হাদীসকে যঈফ বলেছেন। এই হাদীস যঈফ হওয়ার কারণ হচ্ছে, জাবর বিন উবায়দাহ নামক রাবী। তিনি মাজহুল বা অপরিচিত রাবী। তার থেকে শুধুমাত্র সায়য়ার আবূল হাকাম নামক ব্যক্তি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাই তিনি “মাজহুলুল আইন” রাবী।

 

ইমাম যাহাবী তার সম্পর্কে বলেছেন,

 

عن أبي هريرة بخبر منكر لا يعرف من هذا، وحديثه: وعدنا بغزوة الهند

 

আবূ হুরাইরাহ থেকে তার হাদীস মুনকার। তাকে চেনা যায় না। তার হাদীস হল, “রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে গাযওয়ায়ে হিন্দের অঙ্গীকার করেছেন।” [মীযানুল ইতিদাল, ১/৩৮৮]

 

ইমাম যাহাবীর কথানুযায়ী, জাবর বিন উবায়দাহ মাজহুলুল আইন রাবী এবং তার আলোচিত হাদীস মুনকার। স্মর্তব্যঃ মাজহুলুল আইন রাবীর হাদীস মুতাবে‘ ও শাহেদ যোগ্য নয়। অতএব, এই সানাদ মুতাবে‘ ও শাহেদ যোগ্য নয়।

 

ইমাম ইবনে হিব্বান ও হাফেয ইবনে হাজারের তাওসীকের পর্যালোচনা:

 

► ইমাম ইবনে হিব্বান তাকে তার “আস-সিকাত” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। [আস-সিকাত, ৪/১১৭]

এটা সর্বজন স্বীকৃত ব্যাপার যে, ইমাম ইবনে হিব্বানের কাছে রাবী ততক্ষণ পর্যন্ত সিকাহ থাকবে যতক্ষণ না তার ব্যাপারে জারহ পাওয়া যায়। তার মানে তার মতে মাজহুল রাবী সিকাহ। তাই ইমাম ইবনে হিব্বান কাউকে আস-সিকাত গ্রন্থে উল্লেখ করলেই সেই রাবী সিকাহ হবে না। যতক্ষণ না তার পক্ষে অন্য কারো তাওসীক পাওয়া যায়। অতএব, জাবর বিন উবায়দাহ মাজহুল রাবী।

► হাফেয ইবনে হাজার তাকে মাকবুল বলেছেন। [তাকরীব, রাবী নাম্বার, ৮৯২]

হাফেয ইবনু হাজার অনেক সময় তাকরীবুত তাহযীবে এমন রাবীকে মাকবূল বলেন, যাকে ইমাম ইবনে হিব্বান “আস-সিকাত” গ্রন্থে উল্লেখ করেন। অথচ তার ব্যাপারে অন্য কোন মুহাদ্দিসের মতামত পাওয়া যায় না। সেই হিসেবে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী জাবর বিন উবায়দাহকে মাকবূল বলেছেন। আর আমরা ইতঃপূর্বে দেখলাম যে, এধরনের রাবীর ক্ষেত্রে ইমাম ইবনে হিব্বানের তাওসীক গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব, ইমাম ইবনে হিব্বানের উপর নির্ভর করে হাফেয আসকালানীর মাকবূল বলা গ্রহণযোগ্য নয়।

 

শাইখ শোয়াইব আরনাঊত ও শাইখ বাশশার হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর এ মতের সমালোচনায় বলেন, তার থেকে বর্ণনাকারী একজন। তাকে শুধু ইবনে হিব্বান তাওসীক্ব করেছেন। আর তিনি মাজহুল রাবীকে তাওসীক্ব করেন। তাই এ রাবী মাজহুল। [তাহরীরুত তাকরীব, ১/২০৯]

 

শাইখ আহমাদ শাকেরের জবাব

 

শাইখ আহমাদ শাকের এই হাদীসের সানাদকে সহীহ বলেছেন। [শাইখ আহমাদ শাকেরের তাহকীকে মুসনাদ আহমাদ, হা/৭১২৮]

 

শাইখ আহমাদ শাকের জাবর বিন উবায়দাহকে সিকাহ বলেছেন। তার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম ইবনে হিব্বান তাকে “আস-সিকাত” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং হাফেয আসকালানী তাকে মাকবূল বলেছেন। ইমাম বুখারী তাকে “আত-তারীখে”, ইবনু আবী হাতিম তাকে “আল-জারহ ওয়াত তা‘দীল” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম নাসায়ী তার হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু তারা কেউ কোনো মন্তব্য করেননি।

 

আমরা ইতঃপূর্বে ইমাম ইবনে হিব্বান ও হাফেয আসকালানীর বিষয়ে জবাব দিয়েছি। ইমাম বুখারী ও ইমাম ইবনে আবী হাতিম যদি কোনো রাবীকে তাদের স্বীয় গ্রন্থে উল্লেখ করা সত্ত্বেও কোনো মন্তব্য না করেন, তবে সেই রাবী সিকাহ হয়ে যায় না। বরং তার ব্যাপারে অন্যান্য ইমামদের মতামত পাওয়া গেলে বা উক্ত রাবীর ক্ষেত্রে উসূলে হাদীসের যে নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সে অনুযায়ী উক্ত রাবীর মান নির্ধারণ হবে। (বিস্তারিত জানতে দেখুন, আদ্দাব হিমশের “রুওয়াতুল্লাযীনা সাকাতা আলাইহিম আইম্মাতুল জারহ ওয়াত তা‘দীল বায়নাত তাওসীক ওয়াত তাজহীল” গ্রন্থ)। উসূলে হাদীসের নিয়মানুযায়ী ও হাফেয যাহাবীর মতানুযায়ী জাবর বিন উবায়দাহ মাজহুল রাবী।

 

আর ইমাম নাসায়ী কোনো রাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করলেই, সেই রাবী সিকাহ হয়ে যায় না। (বিস্তারিত জানতে দেখুন, শাইখ ইরশাদুল হক্ব আসারীর “ইলাউস সুনান ফীল মিযান”, পৃ/৪৯)

 

অতএব, শাইখ আহমাদ শাকের যেসব যুক্তির আলোকে জাবর বিন উবায়দাহকে সিকাহ বলেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

 

► এই হাদীস অন্য সানাদে ইবনে আবী আসেম তাঁর কিতাবুল জিহাদে (২/৬৬৮, নাম্বার ২৯১) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ সানাদও দুই কারণে যঈফ:

০১) হাশেম বিন সাঈদ নামক যঈফ রাবী ।

০২) কেনানাহ বিন নাবীহ নামক যঈফ রাবী।

 

হাফেয আসকালানী যদিও তাকে মাকবুল বলেছেন কিন্তু সঠিক মতানুসারে তিনি যঈফ। কারণ, তিনি জাবর বিন উবায়দাহকে যে কারণে মাকবূল বলেছেন, ঠিক একই কারণে কেনানাহকেও তিনি মাকবূল বলেছেন। দেখুন তাহরীরুত তাকরীব ৩/২০১।

 

৩য় হাদীস:

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضِيَ الله عنْهُ ، قَالَ حَدَّثَنِى خَلِيلِى الصَّادِقُ رَسُولُ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يكُونُ فِى هَذِهِ الأُمَّةِ بَعْثٌ إِلَى السِّنْدِ وَالْهِنْدِ». “فَإِنْ أَنَا أَدْرَكْتُهُ فَاسْتَشْهَدْتُ فَذَلِكَ وَإِنْ أَنَا – فَذَكَرَ كَلِمَةً – رَجَعْتُ وَأَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ الْمُحَرَّرُ قَدْ أَعْتَقَنِى مِنَ النَّارِ”

 

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার সত্যবাদী বন্ধু রাসূল (সাঃ) আমাকে বলেছেন, এ উম্মাহর একটি দল সিন্ধ ও হিন্দের দিকে যাবে। আমি তা পেলে আমি শাহাদাত বরণ করলে, করলাম। আমি যদি – তারপর কিছু উল্লেখ করলেন – ফিরে আসি, তো আমি আবু হুরাইরাহ মুক্ত। আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৪৪৯]

 

এ হাদীস দুই কারণে যঈফ:

০১) সানাদে বারা বিন আব্দুল্লাহ গানাবী নামক দুর্বল রাবী আছে।

০২) সানাদে হাসান বাসরী ও আবু হুরাইরাহ (রাঃ) এর মাঝে ইনকিতা‘ বা বিচ্ছিন্নতা আছে।

 

৪র্থ হাদীস:

 

عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَمْرٍو ، عَن بعض المشيخة،عن ابي هريرةُ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : «يَغْزُو قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي الْهِنْدَ ، فَيَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ حَتَّى يُلْقُوا بِمُلُوكِ الْهِنْدِ مَغْلُولِينَ فِي السَّلاسِلِ ، يَغْفِرُ اللَّهُ لَهُمْ ذُنُوبَهُمْ ، فَيَنْصَرِفُونَ إِلَى الشَّامِ فَيَجِدُونَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ بِالشَّامِ»

 

সাফওয়ান বিন আমর বর্ণনা করেন তার শায়েখ থেকে, তিনি আবু হুরাইরাহ থেকে, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন,আমার উম্মাহর একটি দল হিন্দে যুদ্ধ করবে।তারা হিন্দ জয় করবে আর হিন্দের রাজাদেরকে জিঞ্জির দিয়ে বেঁধে ফেলা হবে। আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। তারপর তারা সিরিয়া ফিরে যাবে এবং সেখানে ঈসা বিন মারয়াম (আ:) কে পাবে। [নুয়াঈম বিন হাম্মাদ, আল-ফিতান, হা/১২৩৬]

 

এ হাদীস দুই কারণে যঈফ:

০১) বাকিয়ার তাদলীসে তাসবিয়াহর কারণে। যদিও ইসমাঈল ইবনে আইয়্যাশ তার মুতাবাআ‘ত করেছেন। [মুসনাদে ইসহাক্ব ইবনে রাহওয়াইহ, হা/৫৩৭] কিন্তু তিনিও মুদাল্লিস। [ইবনে হাজার আসক্বালানী, ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ৬৮]

০২) সাফওয়ান বিন আমরের উস্তায মাজহুল হওয়ার কারণে

 

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) এর হাদীস কি হাসান পর্যায়ের হবে?

 

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) এর হাদীস মুতাবে‘ দ্বারা হাসান হবে না। কারণ, প্রথম সানাদে মাজহুলুল আইন রাবী আছে। আর মাজহুলুল আইন রাবীর হাদীস মুতাবে‘ ও শাহেদ যোগ্য নয়। আর তৃতীয় ও চতুর্থ হাদীসের সানাদে একই জায়গায় মাজহুল রাবী আছে তথা আবু হুরাইরাহ (রাঃ) এর ছাত্র মাজহুল। তাই সম্ভাবনা রয়েছে দু’সানাদের মাজহুল রাবী একজনই।

 

ইবনে আবী আসেমের সানাদ থেকে বুঝা যাচ্ছে, সেই মাজহুল রাবী কেনানাহ বিন নাবীহ। আর কেনানাহ বিন নাবীহ যঈফ। অতএব কেনানাহ বিন নাবীহ মাদারে সানাদ অর্থাৎ সকল সানাদের কেনানাহ বিন নাবীহ রয়েছে। তাই সব সানাদ মিলেও আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) এর হাদীস হাসান হবে না, বরং তা যঈফ-ই থাকবে। আল্লাহু আ‘লাম।

 

৫ম হাদীস:

 

حَدَّثَنَا الْحَكَمُ بْنُ نَافِعٍ، عَمَّنْ حَدَّثَهُ عَنْ كَعْبٍ، قَالَ: «يَبْعَثُ مَلِكٌ فِي بَيْتِ الْمَقْدِسِ جَيْشًا إِلَى الْهِنْدِ فَيَفْتَحُهَا، فَيَطَئُوا أَرْضَ الْهِنْدِ، وَيَأْخُذُوا كُنُوزَهَا، فَيُصَيِّرُهُ ذَلِكَ الْمَلِكُ حِلْيَةً لَبَيْتِ الْمَقْدِسِ، وَيُقْدِمُ عَلَيْهِ ذَلِكَ الْجَيْشُ بِمُلُوكِ الْهِنْدِ مُغَلَّلِينَ، وَيُفْتَحُ لَهُ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، وَيَكُونُ مَقَامُهُمْ فِي الْهِنْدِ إِلَى خُرُوجِ الدَّجَّالِ»

 

কা‘ব (রাঃ) বলেন, বাইতুল মাকদাসের এক রাজা একটি সৈন্যবাহিনী হিন্দুস্থানের দিকে পাঠাবে। সৈন্যরা হিন্দুস্থানের ভূমি ধ্বংস করে দিবে এবং তার ধন-ভাণ্ডার দখল করে নিবে। তারপর রাজা এসব ধন-সম্পদ দিয়ে বাইতুল মাকদাসকে সজ্জিত করবে। এই দলটি বাইতুল মাকদাসের বাদশাহর দরবারে হিন্দুস্থানের রাজাদেরকে বেঁধে উপস্থিত করবে। ঐ বাদশাহ পূর্ব থেকে পশিম পর্যন্ত সকল এলাকা বিজয় করবে এবং হিন্দুস্থানে ততক্ষণ পর্যন্ত অবস্থান করবে, যতক্ষণ না দাজ্জালের আগমন ঘটে। [নুআইম বিন হাম্মাদ, আল-ফিতান, হা/১২৩৫]

 

এই হাদীস ইনকিতা‘ তথা সানাদে বিচ্ছিন্নতার কারণে যঈফ। শেষ রাবী কা‘ব যদি সাহাবী হন, তবে সানাদে কমপক্ষে দুই জন রাবী মাজহুল রয়েছে। কারণ, হাকাম বিন নাফি‘ তাবা-তাবেয়ী থেকে হাদীস শুনেছেন। তাই কমপক্ষে একজন তাবা-তাবেয়ী ও একজন তাবেয়ীকে সানাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর যদি কা‘ব তাবেয়ী হন, তবে কমপক্ষে একজন রাবীকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। মোট কথা, কা‘ব যেই হোক না কেন এই সানাদে মাজহুল রাবী থাকার কারণে যঈফ।

 

৬ষ্ঠ হাদীস:

 

حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ، ثَنَا صَفْوَانُ بْنُ عَمْرٍو، عَمَّنْ حَدَّثَهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَغْزُو قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي الْهِنْدَ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ حَتَّى يَأْتُوا بِمُلُوكِ الْهِنْدِ مَغْلُولِينَ فِي السَّلَاسِلِ، فَيَغْفِرُ اللَّهُ لَهُمْ ذُنُوبَهُمْ، فَيَنْصَرِفُونَ إِلَى الشَّامِ، فَيَجِدُونَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالشَّامِ»

 

রসূল (সাঃ) বলেন, আমার উম্মাতের কিছু লোক হিন্দুস্থানে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সফলতা দান করবেন। এমনকি তারা হিন্দুস্থানের রাজাদেরকে শিকলবদ্ধ করবে। আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল লোকদেরকে (যারা যুদ্ধ করবে) ক্ষমা করে দিবেন। যখন তারা সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হবে, তখন তারা ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) কে সেখানে পাবে। [নুআইম বিন হাম্মাদ, আল-ফিতান, হা/১২৩৯]

 

এই হাদীস দুই কারণে যঈফঃ

০১) ওয়ালীদ বিন মুসলিম। ওয়ালীদ বিন মুসলিম তাদলীসে তাসবিয়াহ করতেন। [তাকরীবুত তাহযীব, রাবী নং, ৭৫০৬] যদি কোন রাবী তাদলীসে তাসবিয়াহর দোষে দোষাবহ হয়, তবে তার হাদীস তখন সহীহ হবে, যখন সানাদের শেষ পর্যন্ত শ্রবণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে। কিন্তু এই সানাদে সাফওয়ান বিন আমরের পরে আন দিয়ে হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে তথা শ্রবণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

০২) রাবী সফওয়ান বিন আমর “আমাকে হাদীস বলেছেন, রসূল (সাঃ) থেকে” এভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, সাফওয়ান বিন আমর হাদীসটি সাহাবী থেকে শুনেছেন নাকি তাবেয়ী থেকে শুনেছেন, তা স্পষ্ট করে বলেননি। তাই এখানে মাজহূল রাবী রয়েছে। সুতরাং, মাজহূল রাবীর বর্ণনা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

এখানে অনেকে বলতে পারেন যে, তিনি হয়তো কোন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র একজন সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রাঃ) ছাড়া অন্য কোন সাহাবী থেকে হাদীস বর্ণনা করেননি। [যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৬/৩৮০, রাবী নং ১৬০] এমনকি ইমাম ইবনে হিব্বান তাকে তাবা-তাবেয়ী বলেছেন। [ইবনে হিব্বান, মাশাহীরু উলামায়িল আমছার, রাবী নং ১৪১৩]

 

আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তিনি এই হাদীস সাহাবী থেকে শুনেননি; বরং তাবেয়ী থেকে শুনেছেন। কারণ, ৪র্থ হাদীসে আমরা দেখেছি যে, তিনি তার মাজহুল শাইখ থেকে বর্ণনা করেছেন আর তার মাজহুল শাইখ সাহাবী আবূ হুরাইরাহ রাদিআল্লাহু থেকে বর্ণনা করেছেন। তাই অবশ্যই এই সানাদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। অতএব, এমন অকাট্য দলীলের বিপরীতে শুধুমাত্র ধারণা করে বলা উচিত নয় যে, তিনি হয়তো কোন সাহাবী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহু আ‘লাম।

 

৭ম হাদীস:

 

حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، عَنْ جَرَّاحٍ، عَنْ أَرْطَاةَ، قَالَ: «عَلَى يَدَيْ ذَلِكَ الْخَلِيفَةِ الْيَمَانِيِّ الَّذِي تُفْتَحُ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ وَرُومِيَّةُ عَلَى يَدَيْهِ، يَخْرُجُ الدَّجَّالُ وَفِي زَمَانِهِ يَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، عَلَى يَدَيْهِ تَكُونُ غَزْوَةُ الْهِنْدِ، وَهُوَ مِنْ بَنِي هَاشِمٍ»

 

আরতা‘আত বিন মুনযির বলেন, কুসতুনতুনিয়া ও রুম বিজয়ী ইয়ামানী খলীফার সামনে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। সে সময় ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন আর ঈসা (আঃ) এর সামনে গাযওয়াতুল হিন্দ সংঘটিত হবে। [নুয়াঈম বিন হাম্মাদ, আল-ফিতান, হা/১২৩৮]

 

এই হাদীস ওয়ালীদ বিন মুসলিমের কারণে যঈফ। ওয়ালীদ বিন মুসলিমের ব্যাপারে ৬ষ্ঠ হাদীসে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া এটা রাসূল (সাঃ) এর বাণী নয়; বরং আরতা‘আত বিন মুনযির নামক এক তাবেয়ীর বাণী।

 

আমরা দেখলাম গাযওয়াতুল হিন্দের ব্যাপারে বর্ণিত সাওবানের হাদীস তথা প্রথম হাদীস ছাড়া সব হাদীস যঈফ। প্রথম সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়নি, তা কখন হবে: শেষ যুগে, না মাহদীর যুগে, না আগেই হয়ে গেছে?

 

ইবনে কাসীর, মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহহাব বুহায়রী ও সালেহ মুনাজ্জিদের মতে, এ যুদ্ধ আগেই হয়ে গেছে মুহাম্মাদ বিন কাসেম বা ইবনে সুবক্তগীনের বিজয়ের মাধ্যমে। [ইসলাম কিউ এ ওয়েবসাইট, জবাব নাম্বার ১৪৮৫২৯]

 

অতএব ইমাম মাহদীর সময়ে বা শেষ যুগে গাযওয়াতুল হিন্দুকে নির্দিষ্ট করা যুক্তিসংগত ও দলীলসম্মত নয়। সর্বোচ্চ আমরা বলতে পারি, গাযওয়ায়ে হিন্দ হয়ে গেছে আর না হলে হতে পারে। কিন্তু শেষ যুগের সাথে খাস করে “সামনে হবে” বলা ঠিক হবে না। আল্লাহু আ‘লাম।

 

সংকলকঃ আব্দুল্লাহ মাহমূদ

© Shottanneshi – সত্যান্বেষী কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

(Visited 106 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team