সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

আসরের পর (সূর্য উঁচুতে থাকা অবস্থায়) নফল সলাত আদায়ের কোন প্রমাণ আছে কি?

 

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পশ্চাতে রয়েছে একটি ধৈর্যের যুগ। সে সময় যে ব্যক্তি সুন্নাতকে শক্ত করে আকড়ে ধরে থাকবে, সে ৫০ জন শহীদের সমান নেকী পাবে’। উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্য থেকে ৫০ জন নাকি তাদের? তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে ৫০ জন’। [ত্ববারানী, আল-মু’জামুল কাবীরঃ ১০২৪০, সিলসিলা সহীহাঃ ৪৯৪, সহীহুল জামেঃ ২২৩৪, সানাদ সহীহ]

 

সূর্য উচুতে অবস্থান করা পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কর্তৃক আসরের পর যে কোন সলাত আদায় করতে পারার দলীলসমূহ

হাদীস-১

 لَا تُصَلُّوا بَعْدَ الْعَصْرِ إِلَّا أَنْ تُصَلُّوا وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ

আলী ইবনে আবী ত্বলিব (রাঃ) নবী (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেনঃ ”আসরের পর সূর্য উচুতে থাকা অবস্থা ব্যতীত তোমরা সলাত আদায় করো না।” [মুসনাদ আহমাদঃ ১০৭৩, ১০৭৬, ১১৯৪]

# ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ”যখন সূর্যের উপরের প্রান্ত উদিত হয়, তা দিগন্তের উপরে উঠে আসা পর্যন্ত সলাত আদায়ে বিলম্ব কর এবং যখন সূর্যের নিচের প্রান্ত ডুবে যায়, তা সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত সলাত আদায়ে বিলম্ব কর।” [বুখারীঃ ৫৪৮, মুসলিমঃ ১৩৭১]

হাদীস-২

حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ هِلَالِ بْنِ يَسَافٍ، عَنْ وَهْبِ بْنِ الْأَجْدَعِ، عَنْ عَلِيٍّ، «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْعَصْرِ، إِلَّا وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ

হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ”নবী (সাঃ) আমাদেরকে আসরের পর সলাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন, তবে সূর্য উপরে থাকা অবস্থা ব্যতীত (অর্থাৎ তখন এটি বৈধ)।” [মুসনাদ আহমাদঃ ১/৮০-৮১, ১২৯, ১৪১; সুনান আবু দাউদঃ ১২৭৪; বাইহাক্বী আস-সুনানুল কুবরাঃ ২/৫৫৯, সানাদ হাসান]

বিভিন্ন সানাদে একই হাদীস পাওয়া যাবেঃ [সুনান নাসাঈঃ ৫৭৩, বাইহাক্বীর সুনানুল কুবরাঃ ৪৪০৪, সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ১৫৪৭, ইমাম শাফেঈ এর কিতবুল উম্মঃ ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৭৫ ইত্যাদি]

উপরে বর্ণিত হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের তাহক্বীক্বঃ

০১. ইমাম ইবনে খুযায়মাহ [হাদীসঃ ১২৮৪]

০২. ইমাম ইবনে হিব্বান [হাদীসঃ ১৫৪৭]

০৩. ইমাম ইবনুল জারূদ [২৮১]

০৪. ইমাম জিয়া আল মাক্বদিসী [৭৬৩-৭৬৬]

০৫. হাফেয ইবনুল ইরাক্বী [তারাহুল তাসরীবঃ ২/১৮৭]

০৬. আব্দুল হক্ব আল-আশবাইলী [আল-আহকামুস সুগরাঃ ১৬৪]

০৭. শাইখ আহমাদ শাকির [মুসনাদ আহমাদঃ ২/২৮২]

০৮. শাইখ আলবানী [সিলসিলাহ আস-সহীহাহঃ ২০০] এবং অন্যরা একে সহীহ বলেছেন।

০৯. হাফেয মুনযিরী এর সানাদকে ‘জাইয়েদ’ বলেছেন।

১০. হাফেয ইবনে হাজার [ফাতহুল বারীঃ ২/১৬১] এবং ইমাম নববী [মাজমূঃ ৪/১৭৪] একে হাসান বলেছেন। এছাড়াও ইবনে হাজার একে ‘সহীহ ক্বাঈ’ বলেছেন। [ফাতহুল বারীঃ ২/১৬৩]

 

ইমাম ইবনে হাযম বলেনঃ وھذہ زیادۃ عدل، لایجوز ترکھا

এটি নির্ভরযোগ্য রাবীর ‘যিয়াদাহ’ (বর্ণিত অতিরিক্ত অংশ) যা বর্জন করা বৈধ নয়। [আল-মুহাল্লাঃ ৩/৩১] তিনি আরও বলেনঃ এই বর্ণনা থেকে দলীল গ্রহণ কর। [আল-মুহাল্লাঃ ৩/৩১]

 

রাসূল (সাঃ) কর্তৃক আসরের পর ২ রাক‘আত সলাত আদায় করার দলীলসমূহ

হাদীস-১

حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الوَاحِدِ، قَالَ: حَدَّثَنَا الشَّيْبَانِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ الأَسْوَدِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: ” رَكْعَتَانِ لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَعُهُمَا سِرًّا وَلاَ عَلاَنِيَةً: رَكْعَتَانِ قَبْلَ صَلاَةِ الصُّبْحِ، وَرَكْعَتَانِ بَعْدَ العَصْرِ “

আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ ”এমন দুইটি সলাত আছে যা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার বাড়িতে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে  আদায় করা কখনও ছাড়তেন না – ফজরের পূর্বে ২ রাক’আত এবং আসরের পরে ২ রাক’আত।” [সহীহ বুখারীঃ ৫৯২]

হাদীস-২

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَرْعَرَةَ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، قَالَ: رَأَيْتُ الأَسْوَدَ، وَمَسْرُوقًا، شَهِدَا عَلَى عَائِشَةَ قَالَتْ: «مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْتِينِي فِي يَوْمٍ بَعْدَ العَصْرِ، إِلَّا صَلَّى رَكْعَتَيْنِ»

আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ”রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আসরের পর কোন সময় আমার নিকটে আসলে ২ রাক’আত সলাত আদায় করতেন।”[সহীহ বুখারীঃ ৫৯৩]

হাদীস-৩

حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الوَاحِدِ بْنُ أَيْمَنَ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي أَنَّهُ، سَمِعَ عَائِشَةَ، قَالَتْ: وَالَّذِي ذَهَبَ بِهِ، مَا تَرَكَهُمَا حَتَّى لَقِيَ اللَّهَ، وَمَا لَقِيَ اللَّهَ تَعَالَى حَتَّى ثَقُلَ عَنِ الصَّلاَةِ، وَكَانَ يُصَلِّي كَثِيرًا مِنْ صَلاَتِهِ قَاعِدًا – تَعْنِي الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ العَصْرِ – «وَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّيهِمَا، وَلاَ يُصَلِّيهِمَا فِي المَسْجِدِ، مَخَافَةَ أَنْ يُثَقِّلَ عَلَى أُمَّتِهِ، وَكَانَ يُحِبُّ مَا يُخَفِّفُ عَنْهُمْ»

আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ”আল্লাহর কসম! যিনি নবী (সাঃ) কে নিয়ে নিয়েছেন, আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করা পর্যন্ত তিনি কখনও আসরের পরে তা (২ রাক’আত) ছাড়েন নি। আর তিনি আল্লাহর সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষাত করেন নি যতক্ষণ না দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করা তার জন্য ভারি হয়ে যায়, তাই অধিকাংশ সলাত তিনি বসে আদায় করতেন। (তিনি বুঝালেন আসরের পরের ২ রাক’আত) তিনি তা বাড়িতে আদায় করতেন এবং কখনও মসজিদে আদায় করতেন না যাতে করে তার উম্মাতের জন্য কঠিন না হয়ে যায়। আর তিনি তাদের জন্য যা সহজ হয় তা পছন্দ করতেন।” [সহীহ বুখারীঃ ৫৯০]

 

সাহাবীদের থেকে আসরের ফরজের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করার দলীলসমূহ

দলীল-১

حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ أَشْعَثَ بْنِ أَبِي الشَّعْثَاءِ قَالَ: «خَرَجْتُ مَعَ أَبِي، وَعَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، وَالْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ، وَأَبِي وَائِلٍفَكَانُوا يُصَلُّونَ بَعْدَ الْعَصْرِ رَكْعَتَيْنِ

আশয়াস বিন আবী শা’সা (রাহঃ) বলেনঃ  ”আমি আমার বাবা (আবু শা’সা) এর সাথে এক সফরে বের হয়েছিলাম। আমর বিন মাইমুন, আসওয়াদ বিন ইয়াযিদ এবং আবু ওয়াইল, তারা সবাই আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন।” [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহঃ ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩৩, হাদীস ৭৩৪৮]

দলীল-২

حَدَّثَنَا عَلِيٌّ، قَالَ: ثنا حَجَّاجٌ، قَالَ: ثنا حَمَّادٌ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، قَالَ: رَأَيْتُ عَائِشَةَ تُصَلِّي بَعْدَ الْعَصْرِ رَكْعَتَيْنِ وَهِيَ قَائِمَةٌ , وَكَانَتْ مَيْمُونَةُ تُصَلِّي أَرْبَعًا وَهِيَ قَاعِدَةٌ , فَذَكَرَ نَحْوَهُ

ইমাম সাঈদ বিন যুবায়ের (রাহঃ) বলেনঃ ”আমি আয়িশা (রাঃ) কে আসরের পরে ২ রাকা’আত সলাত দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেছি, আর মায়মুনাহ (রাঃ) ৪ রাকা’আত বসে আদায় করতেন।” [ইবনুল মুনযিরের আল-আওসাত্বঃ ২/৩৯৩, হাদীস ১১০১, সানাদ হাসান]

টীকাঃ

রাবী হাম্মাদ বিন সালামাহ হাদীসটি তার ইখতিলাতের পূর্বে আত্বা বিন সাইব থেকে শুনেছেন, যেমনটি জমহুর নিশ্চিত করেছেন।

দলীল-৩

حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ مُعَاذٍ، عَنِ ابْنِ عَوْنٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ أَبَا بُرْدَةَ بْنَ أَبِي مُوسَى يُصَلِّي بَعْدَ الْعَصْرِ رَكْعَتَيْنِ

আব্দুল্লাহ বিন আউন (রাহঃ) বলেনঃ ”আমি আবু বুরদা বিন আবী মূসা (রাঃ) কে আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতে দেখেছি।” [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহঃ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩৩, হাদীস ৭৩৪৭]

দলীল-৪

كُنَّا مَعَ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فِي سَفَرٍ فَصَلَّى بِنَا الْعَصْرَ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ دَخَلَ فُسْطَاطَهُ، وَأَنَا أَنْظُرُ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ

আসিম বিন যামরাহ (রাহঃ) বর্ণনা করেনঃ ”আমরা আলী (রাঃ) এর সাথে এক সফরে ছিলাম, তিনি আমাদেরকে নিয়ে ২ রাকা’আত আসরের সলাত পড়লেন এবং এরপর তার তাবুতে প্রবেশ করলেন। আর আমি তাকে ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতে দেখলাম।” [বাইহাক্বীর সুনানুল কুবরাঃ ২/৪৫৯, সানাদ হাসান]

দলীল-৫

উরওয়া বিন যুবায়ের (রাহঃ) বর্ণনা করেনঃ ”হযরত তামীম দারী (রাঃ) আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন। আর তিনি এটাও বলতেন যে,

ان الزبیر و عبداللہ بن الزبیر کانا یصلیان بعد العصر رکعتین

যুবায়ের (ইবনে আওয়াম) এবং আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাঃ) ও আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন।” [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহঃ ২/৩৫৩, ইবনুল মুনযিরের আল-আওসাত্বঃ ২/৩৯৪, সানাদ সহীহ]

দলীল-৬

حَدَّثَنِي الحَسَنُ بْنُ مُحَمَّدٍ هُوَ الزَّعْفَرَانِيُّ، حَدَّثَنَا عَبِيدَةُ بْنُ حُمَيْدٍ، حَدَّثَنِي عَبْدُ العَزِيزِ بْنُ رُفَيْعٍ قَالَ: رَأَيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ الزُّبَيْرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا يَطُوفُ بَعْدَ الفَجْرِ وَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ،  – قَالَ عَبْدُ العَزِيزِ: وَرَأَيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ الزُّبَيْرِ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ بَعْدَ العَصْرِ، – وَيُخْبِرُ أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا حَدَّثَتْهُ: «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَدْخُلْ بَيْتَهَا إِلَّا صَلَّاهُمَا»

আবিদাহ বিন হুমাইদ (রাহঃ) বলেনঃ আব্দুল আযীয বিন রুফাই বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাঃ) কে সকালের সলাতের পর কা’বা তাওয়াফ করতে দেখলাম, আর এরপর তিনি ২ রাক’আত সলাত আদায় করলেন। তিনি আরও বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাঃ) কে আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করতে দেখলাম। তিনি আমাকে জানালেন, আয়িশা (রাঃ) তাকে বলেছেন যে, নবী (সাঃ) যখনই তার বাড়িতে প্রবেশ করতেন এই ২ রাক’আত সলাত আদায় করতেন।[সহীহ বুখারীঃ ১৬৩০, ১৬৩১]

দলীল-৭

তাউস ইবনে কায়সান (রাহঃ) বলেনঃ

ورخص فی الرکعتین بعد العصر

‘ইবনে উমার (রাঃ) আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায়ের অনুমতি দিয়েছেন।’ [সুনান আবু দাউদঃ ১২৮৪, বাইহাক্বীর সুনানুল কুবরাঃ ২/৪৭৬, সানাদ হাসান]

দলীল-৮

لَوْ لَمْ أُصَلِّهِمَا إِلَّا أَنِّي رَأَيْتُ مَسْرُوقًا يُصَلِّيهِمَا لَكَانَ ثِقَةً، وَلَكِنِّي سَأَلْتُ عَائِشَةَ فَقَالَتْ«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَدَعُ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْفَجْرِ وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعَصْرِ

ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ বিন মুনতাসির (রাহঃ) তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (তার বাবা) আসরের পর ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন, তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ ”আমি কেন সেগুলো আদায় করবো না? আমি মাসরূক্ব কে দেখেছি তিনি ২ রাকা’আত আদায় করতেন, আর তিনি ছিলেন সিক্বাহ। কিন্তু আমি আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফজরের পূর্বে ২ রাকা’আত এবং আসরের পরে ২ রাকা’আত সলাত কখনও ছাড়েন নি।” [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহঃ ২/১৩৩, সানাদ সহীহ]

দলীল-৯

উমার (রাঃ)বলেনঃ

لاَ تَحَرَّوْا بِصَلاَتِكُمْ طُلُوعَ الشَّمْسِ وَلاَ غُرُوبَهَا

‘তোমরা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সলাত আদায়ের ইচ্ছা করো না।’ [মুয়াত্তা ইমাম মালেকঃ ১/১৭৩, সানাদ সহীহ]

(অর্থাৎ তার মতে কোন ব্যক্তি যে কোন সময় সলাত আদায় করতে পারবে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় ব্যতীত)

দলীল-১০

سَأَلْتُ عَائِشَةَ عَنْ صَلاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَيْفَ كَانَ يُصَلِّي؟ قَالَتْ: كَانَ يُصَلِّي الْهَجِيرَ ثُمَّ يُصَلِّي بَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ يُصَلِّي الْعَصْرَ ثُمَّ يُصَلِّي بَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ، فَقُلْتُ: فَقَدْ كَانَ عُمَرُ يَضْرِبُ عَلَيْهِمَا وَنَهَى عَنْهُمَا، فَقَالَتْ: قَدْ كَانَ عُمَرُ يُصَلِّيهِمَا، وَقَدْ عَلِمَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّيهِمَا وَلَكِنْ قَوْمَكَ أَهْلُ الدِّينِ قَوْمٌ صِغَارٌ يُصَلُّونَ الظُّهْرَ ثُمَّ يُصَلُّونَ مَا بَيْنَ الظُّهْرِ وَالْعَصْرِ وَيُصَلُّونَ الْعَصْرَ ثُمَّ يُصَلُّونَ بَيْنَ الْعَصْرِ وَالْمَغْرِبِ فَضَرَبَهُمْ عُمَرُ وَقَدْ أَحْسَنَ

শুরইয়াহ বিন হানি (রাহঃ) বর্ণনা করেনঃ ”আমি আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেছি যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কিভাবে সলাত আদায় করতেন? উত্তরে তিনি বলেন, তিনি যুহরের সলাত আদায় করতেন এবং এরপর ২ রাকা’আত পড়তেন। অতঃপর তিনি আসরের সলাত আদায় করতেন এবং এরপরও ২ রাকা’আত পড়তেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু উমার (রাঃ) লোকদেরকে এই ২ রাকা’আত পড়ার জন্য প্রহার করতেন এবং তিনি তা পড়তে নিষেধ করতেন। তিনি বলেন, উমার নিজেই এই ২ রাকা’আত সলাত আদায় করতেন এবং তিনি জানতেন যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও এই ২ রাকা’আত আদায় করতেন, কিন্তু তোমাদের ক্বউমের লোকেরা নির্বোধ ছিল, তারা যুহরের পর আসর পর্যন্ত সলাত আদায় করতো এবং আসরের পর মাগরিব পর্যন্ত নফল সলাত আদায় করতো। আর তাই উমার তাদেরকে প্রহার করতেন, তিনি ভালই করেছেন।” [মুসনাদ সাররাজঃ ১৫৩০, সানাদ সহীহ, শাইখ ইরশাদুল হক্ব আসারী ‘তাহক্বীক্ব মুসনাদ সিরাজ’ এ একে সহীহ বলেছেন; মুসনাদ আহমাদঃ ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ১৪৫, ইবনে হিব্বানঃ ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৫১; সিলসিলা সহীহাঃ ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা ১০১৩]

 

আসরের পর সলাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞাসূচক দলীলসমূহ

মারফূ‘ হাদীস-১

حَدَّثَنَا عَبْدُ العَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي عَطَاءُ بْنُ يَزِيدَ الجُنْدَعِيُّ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا سَعِيدٍ الخُدْرِيَّ، يَقُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لاَ صَلاَةَ بَعْدَ الصُّبْحِ حَتَّى تَرْتَفِعَ الشَّمْسُ، وَلاَ صَلاَةَ بَعْدَ العَصْرِ حَتَّى تَغِيبَ الشَّمْسُ»

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ ‘ফজরের পর সূর্য পুরোপুরি উদিত না হওয়া পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত কোন সলাত নেই।’ [সহীহ বুখারীঃ ৫৮৬]

মারফূ‘ হাদীস-২

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدَةُ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ خُبَيْبٍ، عَنْ حَفْصِ بْنِ عَاصِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: ” نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَلاَتَيْنِ: بَعْدَ الفَجْرِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، وَبَعْدَ العَصْرِ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ “

আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ২টি সলাত আদায় করতে নিষেধ করেছেনঃ

১) সকালের সলাতের (ফজরের) পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত

২) আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত  [সহীহ বুখারীঃ ৫৮৮]

মারফূ‘ হাদীস-৩

وَذَلِكَ أَنَّ عَلِيَّ بْنَ شَيْبَةَ حَدَّثَنَا قَالَ: ثنا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ , قَالَ: أنا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ , عَنِ الْأَزْرَقِ بْنِ قَيْسٍ , عَنْ ذَكْوَانَ , عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ , قَالَتْ: ” صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْعَصْرَ , ثُمَّ دَخَلَ بَيْتِي , فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ , فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، صَلَّيْتَ صَلَاةً لَمْ تَكُنْ تُصَلِّيهَا , قَالَ: ” قَدِمَ عَلَيَّ مَالٌ فَشَغَلَنِي عَنْ رَكْعَتَيْنِ كُنْتُ أُصَلِّيهِمَا بَعْدَ الظُّهْرِ فَصَلَّيْتُهُمَا الْآنَ ” قُلْتُ:

يَا رَسُولَ اللهِ أَفَنَقْضِيهِمَا إِذَافَاتَتَا , قَالَ: ” لَا

রাসূল (সাঃ) ব্যস্ততার কারণে যুহরের ছেড়ে যাওয়া ২ রাক’আত সলাত আসরের পর আদায় করেন। উম্মে সালামাহ (রাঃ) এমন ক্ষেত্রে তার আমল অনুসরণ করতে চাইলে তিনি তা নিষেধ করেন। [শারহ মা’আনিল আসারঃ ১/৩০৬, হাদীস নং ১৮৩৭]

মাওকুফ হাদীস-১

وَهَذَا الْحَدِيثُ هُوَ أَثْبَتُ الأَحَادِيثِ ، رَوَاهُ عَنْ قَتَادَةَ جَمَاعَةٌ مِنْهُمْ : شُعْبَةُ ، وَسَعِيدُ بْنُ أَبِي عَرُوبَةَ ، وَهِشَامٌ الدَّسْتُوَائِيُّ ، وَأَبَانٌ الْعَطَّارُ ، وَهَمَّامُ بْنُ يَحْيَى ، وَمَنْصُورُ بْنُ زَاذَانَ ، وَلَمْ يَخْتَلِفُوا فِيهِ , وَإِلَيْهِ ذَهَبَ ابْنُ عَبَّاسٍ أَنَّهُ سَأَلَهُ عَنِ الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعَصْرِ فَنَهَاهُ عَنْهُمَا ، فَقَالَ : لا أَدَعُهُمَا ، فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ : وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ سورة الأحزاب آية 36 

তাউস (রাহঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে তা করতে নিষেধ করেন এবং বলেনঃ আমি জানি না এর জন্য তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে নাকি পুরস্কৃত করা হবে। আর তিনি সূরা আহযাবের ৩৬ নং আয়াত তিলাওয়াত করেন। [তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ৩৩/৩৬, আল-ইসতিযকারঃ ১/১১৪; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক্বঃ ২/৪৩৩, সুনানে দারেমীঃ ১/৪০২, মা’আরেফা সুনান ওয়াল আসারঃ ১/১২৯ এবং ৩/৪১৬, সুনানুল কুবরাঃ ২/৬৩৫]

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘ফজরের পর সূর্য উদিত না হওয়া পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত কোন সলাত নেই।’ [কিতাবুল ইসতিযকারঃ সলাতের ওয়াক্তসমূহ অধ্যায়, হাদীস নং ৪২]

 

عَنْ هُشَيْمٍ، أَوْ غَيْرِهِ قَالَ: أَخْبَرَنِي أَبُو حَمْزَةَ قَالَ: سَأَلْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ: عَنِ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْعَصْرِ، فَقَالَ: «صَلِّ مَا شِئْتَ إِلَى اللَّيْلِ» قَالَ: «وَلَقَدْ رَأَيْتُ عُمَرَ يَضْرِبُ الرَّجُلَ يَرَاهُ يُصَلِّي بَعْدَ الْعَصْرِ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে আসরের পর সলাত আদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ তোমার ইচ্ছা মত রাতে (সূর্য অস্ত যাওয়ার পর) সলাত আদায় কর। তিনি বলেনঃ আমি উমার ইবনে খাত্তাব কে দেখেছি এক ব্যক্তিকে প্রহার করতে যে আসরের পর সলাত পড়েছিল। [মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক্বঃ ২/৪৩২]

 

সূর্য অস্ত যেতে শুরু করা থেকে নিয়ে তা পুরোপুরি অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সময়টুকু বাদ দিয়ে আসরের পর সলাত আদায় যে জায়েয, এর দলীলসমূহ

হাদীস-১

ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ‘যখন সূর্যের উপরের প্রান্ত উদিত হয়, তা দিগন্তের উপরে উঠে আসা পর্যন্ত সলাত আদায়ে বিলম্ব কর এবং যখন সূর্যের নিচের প্রান্ত ডুবে যায়, তা সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া পর্যন্ত সলাত আদায়ে বিলম্ব কর।’ [বুখারীঃ ৫৪৮, মুসলিমঃ ১৩৭১]

হাদীস-২

উক্ববাহ বিন আমির যুহানী (রাঃ) বলেনঃ তিন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে সলাত আদায় করতে অথবা মৃতদেহ কবর দিতে নিষেধ করেছেনঃ

১) সূর্য স্পষ্টভাবে উদিত হওয়া শুরু থেকে নিয়ে তা পুরোপুরি উদিত হওয়া পর্যন্ত

২) মধ্যাহ্নে যখন সূর্য সরাসরি মাথার উপর থাকে তা থেকে নিয়ে সূর্য এর শীর্ষবিন্দু অতিক্রম করা পর্যন্ত

৩) সূর্য ডুবতে যাওয়া শুরু থেকে নিয়ে তা পুরোপুরি ডোবা পর্যন্ত। [সহীহ মুসলিমঃ ১৩৭৩]

হাদীস-৩

لا تصلوا عند طلوع الشمس ، و لا عند غروبها فإنها تطلع و تغرب على قرن شيطان ، و صلوا بين ذلك ما شئتم

আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ ‘সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সলাত আদায় করো না, কারণ এটি (সূর্য) উদিত হয় এবং ডুবে যায় শয়তানের দুই শিং এর মাঝে, তবে তোমরা চাইলে এর মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করতে পার।’ [মুসনাদ আবু ইয়ালাঃ ৪৬১২, সানাদ হাসান, আলবানী এবং অন্যান্যদের তাহক্বীক্ব]

হাদীস-৪

أنبأ أَبُو طَاهِرٍ الْفَقِيهُ، وَأَبُو سَعِيدِ بْنُ أَبِي عَمْرٍو قَالَا: أنبأ أَبُو الْعَبَّاسِ هُوَ الْأَصَمُّ، أنبأ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ، أنبأ مُحَمَّدُ بْنُ سَابِقٍ، أنبأ إِبْرَاهِيمُ بْنُ طَهْمَانَ، عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ بَابَاهْ، عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، أَنَّهُ طَافَ بَعْدَ الْعَصْرِ عِنْدَ مَغَارِبِ الشَّمْسِ، فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ غُرُوبِ الشَّمْسِ، فَقِيلَ لَهُ: يَا أَبَا الدَّرْدَاءِ أَنْتُمْ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَقُولُونَ: لَا صَلَاةَ بَعْدَ الْعَصْرِ حَتَّى تَغْرُبَ الشَّمْسُ، فَقَالَ: ” إِنَّ هَذِهِ الْبَلْدَةَ بَلْدَةٌ لَيْسَتْ كَغَيْرِهَا ” وَهَذَا الْقَوْلُ مِنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ يُوجِبُ تَخْصِيصَ الْمَكَانِ بِذَلِكَ وَاللهُ أَعْلَمُ، وَرُوِيَ فِي فِعْلِهِمَا بَعْدَ الطَّوَافِ فِي هَذَا الْوَقْتِ، عَنْ طَاوُسٍ، وَالْقَاسِمِ بْنِ مُحَمَّدٍ، وَقَالَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ: ” إِذَا طُفْتَ فَصَلِّ “، وَرُوِيَ عَنْ جَمَاعَةٍ مِنَ الصَّحَابَةِ، وَالتَّابِعِينَ أَنَّهُمْ كَانُوا يُؤَخِّرُونَهَا حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ وَتَرْتَفِعَ

আবু দারদা (রাঃ) আসরের পর তাওয়াফ করলেন এবং সূর্যাস্তের পূর্বে ২ রাক’আত সলাত আদায় আদায় করলেন। তাকে বলা হলঃ হে আবু দারদা! আপনি রাসূল (সাঃ) এর সাহাবী হয়েও আসরের পর সলাত আদায় করেন যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন আসরের পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কোন সলাত নেই?  এর উত্তরে তিনি বলেনঃ এই শহর (মক্কা) অন্যান্য শহরের মত নয়।

ইমাম বায়হাক্বী (রাহঃ) বলেনঃ আবু দারদা (রাঃ) এর বক্তব্য থেকে বুঝা যায় এই বিধান কেবল মক্কার জন্য খাস। [সুনানুল কুবরাঃ ২/৬৫০]

হাদীস-৫

নবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘হে বনী আব্দে মানাফ! এই ঘরে তাওয়াফ এবং সলাত আদায় করতে কাউকে বাধা দিও না দিনে কিংবা রাতে যেকোন সময় কেউ তা করতে চাক না কেন।’ [সুনানে তিরমিযীঃ ২/২১২]

ইমাম তিরমিযী (রাহঃ) মন্তব্য করেন এই মর্মে যে, সালাফদের মাঝে কয়েকজন বলেছেন, আসরের পর তাওয়াফ এবং সলাত আদায়ে ক্ষতির কিছু নেই, তাদের মধ্যে রয়েছেন শাফেঈ, আহমাদ এবং ইসহাক্ব। আর অন্যদের মত হল, যদি তুমি আসরের পর তাওয়াফ কর, তবে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সলাত আদায় করো না এবং একই কথা ফজরের পর তাওয়াফের জন্য।

 

আসরের পর সলাত আদায়ে নিষধাজ্ঞাসূচক এবং অনুমতিসূচক হাদীসগুলোর সমন্বয়

১) বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে হলে সর্বপ্রথম আমাদেরকে যা করতে হবে তা হল, আসরের পর সলাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদীসগুলো বিশ্লেষণ করা এবং সেগুলোকে আসরের পর সলাত আদায়ে অনুমতিসূচক হাদীসগুলোর সাথে তুলনা করা।

২) নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদীসগুলোর বক্তব্যঃ

# আসরের পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কোন সলাত নেই।

# সূর্য অস্ত যেতে আরম্ভ করলে তা পুরোপুরি অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কোন সলাত নেই।

কাজেই আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায়, যে সময়ে সলাত আদায় নিষিদ্ধ তা হল যখন সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে যতক্ষণ না তা পুরোপুরি অস্ত যায়। আর এই দাবীকে শক্তিশালী করে আলী (রাঃ) এর হাদীস যেখানে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, সূর্য উপরে থাকা অবস্থায় কেউ আসরের পর চাইলে সলাত আদায় করতে পারে, কিন্তু যখন সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে, তখন সলাত আদায়ে বিরত থাকতে হবে। আর এমন সময়ে সলাত আদায়ে বিরত থাকার কারণসমূহের একটি হল, মুনাফিক্বরা এমনটি করে থাকে।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘এটা (আসরের পর দেরী করে আদায় করা) মুনাফিক্বদের সলাত। তারা বসে বসে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। সূর্যের রঙ হলুদ হয়ে গেলে এবং তা শয়তানের দুই শিং এর মধ্যস্থলে চলে গেলে (সূর্যাস্তের সময়) তারা তাড়াতাড়ি উঠে চার ঠোকর মারে। এতে তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।’ [মুসলিমঃ ৬২২, মিশকাতঃ ৫৯৩]

অতএব এই হাদীস থেকেও এটা স্পষ্ট হল যে, নিষেধাজ্ঞাটি কেবল সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রারম্ভ (যখন তা গাঢ় হলদে-কমলা রঙের হয়) থেকে নিয়ে পুরোপুরি সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

 

বিভিন্ন মুহাদ্দিসীন এবং উলামায়ে কেরামের ফাতাওয়া

১) ইমাম আলবানী (রাহঃ) বলেনঃصلاة مَنسِيَّة ينبغي إحياؤها

‘একটি ভুলে যাওয়া সলাত যা পুনরূজ্জীবিত করা উচিত’। [সিলসিলা সহীহাঃ ৩১৭৪]

তিনি আরও বলেনঃ ‘ফিক্বহের কিতাবগুলোতে যেসব গলদ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গলদ হল এই ২ রাক’আত সলাত পড়তে নিষেধ করা এবং একনিষ্ঠভাবে নফল আমলের ক্ষেত্রে একে উল্লেখ না করা। অথচ রাসূল (সাঃ) এই ২ রাক’আত সলাতকে তেমনি হিফাযত করতেন যেমনভাবে ফজরের পূর্বে ২ রাক’আতকে হিফাযত করতেন। আসরের পর ২ রাক’আত সলাত ছেড়ে দেওয়া অথবা তা রাসূল (সাঃ) এর জন্য খাস হওয়ার কোন দলীল নেই! কিভাবে তা থাকবে, যেখানে এই ২ রাক’আত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত হযরত আয়িশা (রাঃ) সহ অন্যান্য সাহাবী এবং ন্যায়নিষ্ঠ সালাফগণ একে হিফাযত করতেন’। [সিলসিলা সহীহাঃ ৭/৫২৮]

২) ইমাম ত্বাহাবী (রাহঃ) বলেনঃ ‘কতিপয় ব্যক্তি আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায়ে ক্ষতির কিছু দেখেন না এবং একে সুন্নাত হিসেবে বিবেচনা করেন’। [শারহ মা’আনিল আসারঃ ১/৩০১]

৩) ইমাম ইবনে হাযম (রাহঃ) বলেন, ‘…তৃতীয়তঃ যদি এই হাদীস সহীহ হয়, এটি আমাদের জন্য দলীল। হাদীসটি আমাদেরকে রাসূল (সাঃ) কর্তৃক আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করা বিষয়ে অবগত করে। বিপরীতভাবে, যদি এটি বৈধ না হতো অথবা অপছন্দনীয় হতো, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই ২ রাক’আত পড়তেন না। তার আমল হল হিদায়াত এবং সঠিক, হোক তিনি তা একবার করেন অথবা হাজারবার করেন’। [আল-মুহাল্লা]

৪)ইবনে হাজার আস্কালানী (রাহঃ) বলেনঃ ‘এই বর্ণনাগুলোকে আকড়ে ধরলে আসরের পর যে কোন ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত সলাত আদায়ের বৈধতা সাব্যস্ত হয় যতক্ষণ না তা সূর্যাস্তের সময় আদায় করা উদ্দেশ্য হয়’। [ফাতহুল বারীঃ ২/৮৫]

৫) শাইখ মুহাম্মাদ আদম আল-ইথিওপী (হাফিঃ) বলেনঃ ‘অধিকতর গ্রহণযোগ্য অবস্থান হল, আসরের পর সূর্য উজ্জ্বল সাদা থাকা পর্যন্ত সলাত আদায় বৈধ। এই আমলের বিধানের ভিত্তি একটি সহীহ হাদীস, সাহাবী এবং তাবেঈদের আমল…’। [সাখিরাতুল উক্ববাহ ফী শারহ আল-মুজতাবাহঃ ৭/২০২]

৬) শাইখ উবাইদ আল-জাবিরী (হাফিঃ) বলেনঃ ‘ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এমন আছে যারা জানে না যে আসরের সুন্নাত আছে। আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় স্বীকৃত। অনেক লোক এই আমল সম্পর্কে বেখেয়াল হওয়ার কারণে এটি নিয়ে কিছু সন্দেহ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বহুবার এটা নিয়ে জোরালোভাবে বলেছি যে, যদি কোন মুসলিম যুহর এবং আসর একত্রে জমা করে, সে এই দুই সলাতের মাঝে কোন সুন্নাত পড়ে না। কারণ এটা করলে জমা করার আমলের বিরোধী হবে। তাই সে আসর শেষ করার পর চাইলে ২ রাক’আত সলাত পড়তে পারে যেহেতু রাসূল (সাঃ) তা করতেন, যেমটি ইমাম মুসলিম সংকলন করেছেন’।

৭)  ইমাম ইবনুল মুনযির বলেনঃ

فدلت الأخبار الثابتۃ عن النبی ﷺ علی أن النھی إنما وقع فی ذلک علی وقت طلوع الشمس ووقت غروبھا، فمما دل علی ذلک حدیث علی بن أبی طالب، وابن عمر، وعائشہ رضی اللہ عنھا وھی أحادیث ثابتۃ بأسانید جیاد، لا مطعن لأحد من أھل العلم فیھا

‘রাসূল (সাঃ) থেকে আসরের পর সলাত না আদায় করা বিষয়ে যে বর্ণনাগুলো প্রমাণিত, সেগুলো কেবল সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষেত্রে। এর প্রমাণে যে বর্ণনাগুলো রয়েছে সেগুলো হল আলী ইবনে আবী ত্বলিব, ইবনে উমার এবং আয়িশা (রাঃ) এর বর্ণনা। এই হাদীসগুলো জাইয়েদ সানাদে বর্ণিত হয়েছে, আর আহলে ইলমদের কেউ এর প্রতি কোন আপত্তি করেন নি।’ [আল-আওসাত্বঃ ২/৩৮৮]

৮)ইমাম আলবানী (রাহঃ) এর ছাত্র শাইখ মাশহুর হাসান সালমান (হাফিঃ) সুন্দরভাবে উপসংহার টেনে বলেনঃ ‘আসরের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করা সম্পর্কে আমি আগেও বলেছি যে, রাসূল (সাঃ) তা আদায় করেছেন, তেমনিভাবে সাহাবী এবং তাবেঈদের একটি দল তা আদায় করেছেন যাদের সংখ্যা আমি পেয়েছি ১১ জন, তাদের মধ্য থেকে ১টি বর্ণনাই যথেষ্ট, তা হল আয়িশা (রাঃ) এর বর্ণনা। আর আসরের পর সলাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক যে সকল বর্ণনা রয়েছে সেগুলো সূর্য হলুদ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যতক্ষণ না তা পুরোপুরি অস্ত যায়। কিন্তু যদি সূর্য স্পষ্ট প্রতীয়মান (উচুতে) থাকে, তবে আসরের পর সে সময়ে সলাত আদায় মাকরূহ নয়। আর এটি এ বিষয়ে আসা অসংখ্য হাদীস অনুযায়ী প্রযোজ্য।

এ বিষয়ে আরও জানতে দেখুন ই’লাম আহলুল ‘আসর বিস সুন্নিয়াহ আর-রাক’আতাইন বা’দিল আসর বইটি।

৯) শাইখ ইমরান আইয়্যুব লাহোরী (হাফিঃ) ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এই বিধান সম্পর্কে অবগত করেছেন, আর তিনি উদ্ধৃতি দেন [ফিক্বহুল হাদীসঃ ১/৩২২]। সংক্ষেপে তিনি এতে বলেনঃ অধিকতর সহীহ মত হল, সূর্য উচুতে থাকলে এবং অস্ত যেতে শুরু না করলে আসরের পর যে কোন সলাত আদায় করা বৈধ, হোক তা সুন্নাত, নফল কিংবা জানাযার সলাত।

# আলী (রাঃ) এর হাদীস [সুনান আবু দাউদঃ ১১৩৫]

كتابالصلاة
بابمنرخصفيهماإذاكانتالشمسمورتفهأبوداود١٢٧٤

# সূর্য অস্ত যেতে শুরু না করলে ইবনে উমার (রাঃ) নফল পড়ার অনুমতি দিতেন

مجمعالزوائد (٢/٢٢٣

# ইবনে হাজার (রাহঃ) এর ফাতাওয়া

تلخيصالخبير (١/١٨٥) فتحالباري (٢/٢٥٧)

# সাহাবী এবং তাবেঈদের একটি অংশ আসরের পর সলাত আদায় করতেন

المحلیلابنحزم (٢/٤٢-٤٧) ابنابیشیبه (٢/٣٥١)
شرحمعانيالأثأر (١/٢١٠)

টীকাঃ কিছু আলেম যেমন ইমাম নববী (রাহঃ), আহলে হাদীস আলেম যেমন শাইখ তালেবুর রহমান (যার সাথে আমি কথা বলেছি) এবং অন্যান্যরা এই মত পোষণ করেন যে, আসরের পর ২ রাক’আত সলাত কেবল আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর জন্য খাস ছিল, কারণ ক্বুরআন সুন্নাহ থেকে এটা প্রমাণিত যে, এমন কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো শুধু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর জন্য সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু এই মতটি উপেক্ষিত, কারণ আমাদের নিকট হাদীস রয়েছে যে সাহাবা এবং তাবেঈগণ আসরের পর এই ২ রাক’আত সলাত আদায় করতেন যা প্রমাণ করে,  এটি রাসূল (সাঃ) এর জন্য খাস ছিল না। আর এই মতটি সঠিক হিসেবে পরিগণিত।

 

আসরের পর সলাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শেষকথা

উপরের বিস্তারিত বিবরণ থেকে ২টি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়ঃ

১) যে হাদীসগুলো বিপরীত মত দেয় (অর্থাৎ আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সলাত আদায় নিষিদ্ধ) সেগুলোকে সমন্বয় করতে হবে এবং মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তির কারণ হিসেবে আনা যাবে না। উলামায় কেরাম তাদের সীমাহীন সময় ব্যয় করেছেন এবং প্রচেষ্টা চালিয়েছেন বিভিন্ন উসূল উদ্ভাবন, সেগুলোর সমন্বয়করণ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে ইসলামের বিধান উপলব্ধিকরণ সম্পর্কে শিক্ষাদানে। আমাদের উচিত ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা এবং উম্মাহর উলামায়ে কেরামের দেওয়া সহীহ দলীল সমৃদ্ধ শিক্ষার আলোকে ইসলামকে বুঝার ব্যাপারে অবিচল থাকা। তাই যে হাদীসগুলো আমাদেরকে আসরের পর সলাত আদায়ে নিষেধ করে সেগুলোকে ‘আম’ হাদীস এবং যেগুলো আমাদেরকে আসরের পর সলাত আদায়ে অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃতপক্ষে কোন সময়ে সলাত আদায় নিষিদ্ধ সে বিষয়ে অবগত করে সেগুলোকে ‘খাস’ হাদীস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর এক্ষেত্রে এই উসূলটি প্রয়োগ করা হয়েছে যে, ‘খাস দলীল আম দলীলের উপর প্রাধান্য পাবে’।

২) সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী এবং উত্তম মত হল, কেউ চাইলে আসরের পর সলাত আদায় করতে পারে যতক্ষণ সূর্য স্পষ্টত প্রতীয়মান (উপরে) থাকে, অথবা যতক্ষণ না তা অস্ত যেতে শুরু করে। আর সূর্য অস্ত যেতে শুরু করা থেকে নিয়ে তা পুরোপুরি অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কারও সলাত আদায় করা থেকে কঠিনভাবে বিরত থাকা উচিত।

 

বিভিন্ন মুসলিম ভাই-বোন আগ্রহ এবং সন্দেহের বশে আলোচ্য বিষয়ের উপর প্রায়ই যে সকল প্রশ্ন করে থাকেন

প্রশ্ন-১

এটা কিভাবে সম্ভব যে অন্যান্য সাহাবীরা এ বিষয়ে জানতেন না? সহীহ বুখারীতে মুওয়াবিয়া (রাঃ) থেকে আসরের পর নফল সলাত আদায়ে আপত্তি করা ইত্যাদি হাদীস তো আছে?

উত্তরঃ

এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে সাহাবীরা অনেক সময় কিছু হাদীস সম্পর্কে জানতেন না। আর এটা তাদের মর্যাদাবান হওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না।  আমরা দুয়া করি আল্লাহ নবী (সাঃ) এর পর উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষদের উপর রহম করুন। সংক্ষেপে বলা যায়, যখন সাহাবীরা রাসূল (সাঃ) এর বিতর অথবা তাহাজ্জুদ সলাত সম্পর্কে জানতে চাইতেন তারা আয়িশা (রাঃ) অথবা কোন একজন উম্মুল মু’মিনীন এর নিকট যেতেন কারণ রাসূল (সাঃ) তাদের সাথে রাত্রি অতিবাহিত করতেন এবং তাই তার রাত্রিকালীল আমল সম্পর্কে তারা সবচেয়ে ভাল জানবেন। এর প্রমাণে অসংখ্য হাদীস রয়েছে, বিশেষভাবে বিতরের সলাত, গোসল এবং মেয়েদের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে।

এছাড়াও যখন কিছু সাহাবী (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর যুদ্ধাভিযান, ধর্মীয় উপদেশ অথবা বাইরের কোন কাজ সম্পর্কে জানতে চাইতেন তখন তারা সেই সকল সাহাবীর নিকট গমন করতেন যারা রাসূল (সাঃ) এর সাথে থাকতেন, তার সাথে চলাফেরা করতেন এবং তার সাথে থেকে যুদ্ধ করতেন।

কিছু সাহাবী যে কোন কোন হাদীস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, এর কিছু প্রমাণ পাওয়া যাবেঃ

[সহীহ বুখারীঃ ৮ম খন্ড, কিতাব ৭৪, হাদীস ২৬২; তাবাক্বাত ইবনে সা’দ; সুনান আবু দাউদঃ কিতাবুল হুদুদ, হাদীস ৪৩৮৫]

উপরের ৩টি হাদীস প্রমাণ করে কিভাবে উমার (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর হাদীস না জানার কারণে সাহাবীরা তাকে সংশোধন করে দেন। অতএব এমন আরও অনেক দলীল রয়েছে যেগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সাহাবীরা উম্মাতের সেরা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের কেউ কেউ রাসূল (সাঃ) এর কতক হুকুম সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং অন্য সাহাবীদের মাধ্যমে তারা তা শুধরে নিতেন।

কখনো কখনো কোন সাহাবী এমন আমল করতেন যা অন্য সাহাবীরা করতেন না, এর দলীলঃ

ইয়াহইয়া আমাকে বর্ণনা করেন মালিক থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে আবী সাঈদ মাক্ববুরী থেকে যে, উবাইদ ইবনে যুরাইজ একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) কে বলেনঃ হে আবু আব্দুর রহমান! আমি আপনাকে এমন ৪টি আমল করতে দেখেছি যা অন্য সাহাবীদেরকে করতে দেখি নি। তিনি বলেনঃ হে ইবনে যুরাইজ! সেগুলো কী কী? উত্তরে তিনি বলেনঃ আমি আপনাকে দেখেছি রুকনে ইয়ামানির শুধু ২ প্রান্ত স্পর্শ করতে, লোমবিহীন চামড়ার জুতা পরতে, হলুদ রঙ ব্যবহার করতে এবং যখন আপনি মক্কায় ছিলেন, লোকেরা নতুন চাঁদ দেখে যখন তালবিয়া পাঠ করছিল, আমি দেখলাম আপনি জিলহজ্জের ৮ তারিখ না আসার আগে তা করলেন না।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ আমি রাসূল (সাঃ) কে কেবল রুকনে ইয়ামানির ২ প্রান্ত স্পর্শ করতে দেখেছি। আর আমি তাকে (সাঃ) লোমবিহীন চামড়ার জুতা পরিধান করতে এবং সেগুলো পরিহিত অবস্থায় ওযু করতে দেখেছি এবং আমিও তা পরিধান করতে পছন্দ করি। আমি রাসূল (সাঃ) কে দেখেছি হলুদ রঙ ব্যবহার করতে, আর আমিও রঙ করতে হলুদ রঙ ব্যবহার করা পছন্দ করি। আর আমি কখনও তাকে উটে চড়ে (মিনা এবং আরাফার দিকে) যাত্রা শুরু করার আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতে দেখিনি। [মুওয়াত্তা মালিকঃ কিতাব ২০, হাদীস ৩১; সুনান আবু দাউদঃ কিতাব ১০, হাদীস ১৭৬৮]

কখনো কখনো একজন সাহাবী অন্য সাহাবীদের তুলনায় রাসূল (সাঃ) এর বেশি সংখ্যক আমল সম্পর্কে জানতেনঃ

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ الْوَضَّاحِ، قَالَ: نا وَهْبُ بْنُ جَرِيرٍ، قَالَ: نا أَبِي قَالَ،: سَمِعْتُ مُحَمَّدَ بْنَ إِسْحَاقَ، يُحَدِّثُ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ مَالِكِ بْنِ أَبِي عَامِرٍ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ، فَدَخَلَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا أَبَا مُحَمَّدٍ وَاللَّهِ مَا نَدْرِي هَذَا الْيَمَانِيَّ، أَعْلَمُ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِنْكُمْ أَوْ هُوَ يَقُولُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ يَعْنِي أَبَا هُرَيْرَةَ فَقَالَ طَلْحَةُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ: وَاللَّهِ مَا نَشُكُّ أَنَّهُ قَدْ سَمِعَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا لَمْ نَسْمَعْ وَعَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ , إِنَّا كُنَّا أَقْوَامًا أَغْنِيَاءَ وَلَنَا بُيُوتَاتٌ وَأَهْلُونَ، وَكُنَّا نَأْتِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي طَرَفَيِ النَّهَارِ , [ص:148] وَكَانَ مِسْكِينًا لَا مَالَ لَهُ وَلَا أَهْلَ , إِنَّمَا كَانَتْ يَدُهُ مَعَ يَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانَ يَدُورُ مَعَهُ حَيْثُ مَا دَارَ , وَلَا نَشُكُّ أَنَّهُ قَدْ عَلِمَ مَا لَمْ نَعْلَمْ وَسَمِعَ مَا لَمْ نَسْمَعْ، وَلَمْ نَجِدْ أَحَدًا فِيهِ خَيْرٌ: يَقُولُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ. وَهَذَا الْحَدِيثُ لَا نَعْلَمُ لَهُ عَنْ طَلْحَةَ إِسْنَادًا إِلَّا هَذَا الْإِسْنَادَ، وَلَا نَعْلَمُ رَوَى هَذَا الْكَلَامَ فِي أَبِي هُرَيْرَةَ، إِلَّا طَلْحَةَ

মালিক ইবনে আবী আমীর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি তালহা (ইবনে উবায়দুল্লাহ) এর নিকট আসল এবং বলল, এই ইয়ামানী (আবু হুরায়রাহ) সম্পর্কে আপনি কি জানেন? তিনি কি রাসূল (সাঃ) এর হদীস সম্পর্কে আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন? এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমরা তার নিকট থেকে এমন এমন জিনিস শুনে থাকি যা আপনার নিকট থেকে শুনি না। আমি ব্যাখ্যা করছিঃ আমরা এমন লোক যাদের পরিবার পরিজন ছিল, আর আমরা রাসূল (সাঃ) এর নিকট শুধু সকালে এবং সন্ধ্যায় আগমন করতাম। কিন্তু আবু হুরায়রাহ একজন মিসকীন লোক ছিল যার কোন সম্পদ ছিল না। সে রাসূল (সাঃ) এর দরজায় প্রহরী হিসেবে থাকতো। তাই এতে আমার কোন সন্দেহ নেই যে আমরা যা শুনি নি সে তা শুনেছে। তুমি কি মনে কর, যার মাঝে বিন্দুমাত্র ভাল কিছু আছে সে রাসূল (সাঃ) এর বলা কোন কথা জাল করতে পারে?

# মুসনাদে বাযযারঃ ৯৩২, ইবনে হাজার বলেনঃ এর সানাদ হাসান। [ফাতহুল বারীঃ ৭/৭৫] এটি আরো বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী তার তারীখে এবং আবু ইয়ালা তার মুসনাদে, মুসনাদে আবু ইয়ালা এর মুহাক্বিক্ব হুসাইন সালিম আসাদ বলেনঃ এর সকল রাবী সিক্বাহ। [হাদীসঃ ৬৩৬]

# শাইখ ইরশাদুল হক্ব আসারী এই হাদীস সম্পর্কে বলেনঃ এটি বর্ণনা করেছেন হাকিম [৩/৫১১], বুখারী তার তারীখে [৩/১৩৩], দুলাবী আল-কুনা তে [১/১০] এবং তিরমিযী [৪/৩৫৩] যিনি বলেন, এটি হাসান গারীব। আর ইমাম হাকিম বলেন, এটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। আর ইবনে হাজার ও এর সানাদকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

প্রশ্ন-২ আমরা কিভাবে এটা গ্রহণ করতে পারি যেখানে ৪ মাজহাবের ইমামগণ এর উপর আমল করেন নি?

উত্তরঃ কে বলেছে যে ইসলাম কেবল এই ৪ মাজহাবের উপর ভিত্তিশীল? বাকি ইমামদের কি হবে যাদের নিজস্ব মাজহাব ছিল? কাজেই তাদের মাজহাব ব্যাপভাবে প্রসারিত না হলেও আমাদের নিকট অন্তত এর প্রমাণ তো আছে যে তারা আসরের পর সলাত পড়তেন? আমার মনে হয় নিচের বক্তব্যটি এর সারসংক্ষেপঃ

ইমাম শাফেঈ (রাহঃ) বলেনঃ ‘কোন খবর প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথে তা গ্রহণ করা ওয়াজিব, যদিও ইমামগণ এর উপর আমল না করে থাকেন’। [আর-রিসালাহঃ ৪৬৩]

প্রশ্ন-৩ এই বর্ণনা সম্পর্কে কি বলবেন?

کانرسولاللہﷺیصلیفیاثرکلصلاۃمکتوبۃرکعتینالاالفجروالعصر

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) ফজর এবং আসরের সলাত ব্যতীত প্রত্যেক ফরজ সলাতের পর ২ রাক’আত সলাত আদায় করতেন।

উত্তরঃ হাদীসটি পাওয়া যাবে [সুনান আবু দাউদঃ ১২৭৫, নাসাঈ সুনানুল কুবরাঃ ৪৪১, মুসনাদে আহমাদঃ ১/১২৪, সহীহ ইবনে খুযায়মাহঃ ১১৯৫, বাইহাক্বীর সুনানুল কুবরাঃ ২/৪৫৯]

আর হাদীসটি যঈফ, কারণ আবু ইসহাক্ব সুবঈ হলেন মুদাল্লিস। আর তিনি নিজেই বলেছেনঃ আমি আবু জাহীফা কে এই ২ রাক’আত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এটি তোমাকে উপকৃত না করতে পারলে তোমার কোন ক্ষতিও করবে না’। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহঃ ২/৩৫৩, ইবনে মুনযিরের আল-আওসাত্বঃ ২/৩৯৩, সানাদ সহীহ]

প্রশ্ন-৪ রাসূল (সাঃ) আসরের পর যে সলাত পড়েছিলেন তা ছিল যুহরের সময় ছুটে যাওয়া নফল সলাত, যা তিনি কাযা আদায় করেন।

উত্তরঃ যদি আপনার দাবি হয়ে থাকে যে, রাসূল (সাঃ) আসলে যুহরের ছুটে যাওয়া ২ রাক’আত সলাত আদায় করেছিলেন, আর তিনি একবার কোন আমল করা শুরু করলে তা নিয়মিত করতেন, কখনো ছাড়তেন না; তাহলে আপনার কাছে আমাদের প্রশ্ন, অন্যান্য সাহাবী যে আসরের পর নিয়মিত ২ বা ৪ রাক’আত পড়তেন এ ব্যপারে কি বলবেন? তারাও কি তাদের জীবনের প্রত্যেক দিন যুহরের ছুটে যাওয়া কাযা সলাত আদায় করতেন?

অধিকন্তু, যারা আসরের পর কোন সলাত আদায় করতে নিষেধ করেন, তারাও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তা আদায়ে অনুমতি দেন যেমনঃ

১) যুহরের ছুটে যাওয়া সলাত

২) সলাতুল ইসতিসকা

৩) সূর্যগ্রহণের সলাত

৪) জানাযার সলাত

৫) তাওয়াফ করার পর ২ রাক’আত সলাত

৬) তাহিয়্যাতুল মাসজিদ

৭) যে ব্যক্তি জামা’আত পায় নি তাকে সেই ব্যক্তির সলাত পড়ানো যে ইতিমধ্যেই আসরের সলাত পড়ে নিয়েছে, আর তা হবে তার জন্য ফরজ এবং ইমামের জন্য নফল। তার মানে দাঁড়ায়, ইমাম এভাবে আসরের পর ৪ রাকা’আত নফল সলাত পড়বে।

এ প্রবন্ধে বর্ণিত হাদীস ও আসার এর তাহকীক ও তাখরীজ শাইখ যুবাইর আলী যাঈ রাহিমাহুল্লাহ এর ছাত্র শাইখ গুলাম মুস্তাফা যাহীর আমানপুরির প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে।

সংকলকঃ ওমার ইবনে সেলীম

অনুবাদকঃ নাজমুস সাক্বিব

মূল উৎসঃ Praying two rakah sunnah after Salatul Asr

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

 
(Visited 235 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team