সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।

“আখেরী মুনাজাত” – একটি ইসলামিক দৃষ্টিকোণ

 

কোনো বৈঠক, সভা, বা দ্বীনি মাজলিস চলাকালীন সময়ে বারবার বিভিন্ন দু’আ করা মাজলিসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মাজলিসের অন্যতম বিষয় হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা তথা আল্লাহর যিকর করা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আল্লাহর কাছে চাওয়া। কোনো মাজলিস চলাকালে করার সময় মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ না করা লাঞ্ছনার কারণ : আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘’যে ব্যক্তি কোনো স্থানে বসলো অথচ আল্লাহকে স্মরণ করলো না, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে লাঞ্ছনা। আর যে ব্যক্তি কোথাও শয়ন করলো অথচ আল্লাহর নাম নিলো না, তার জন্যও আল্লাহর পক্ষ হতে লাঞ্ছনা’’। আবু দাউদ ৪৮৫৬ (আলবানি হাসান সহীহ বলেছেন)

 

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো বৈঠক বা মাজলিস চলাকালে আল্লাহ তায়ালার কাছে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন :

 

ইবন উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রতিটি মাজলিসে হিসাব করে দেখা গেছে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উক্ত মাজলিস হতে উঠে যাওয়ার আগে একশতবার বলতেন ‘’রাব্বিগ ফিরলি ওয়াতুব আলাইয়া ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুল গাফুর’’ (অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন। কারণ আপনিই তাওবা কবুলকারী, ক্ষমাকারী)’’ তিরমিযি ৩৪৩৪; ইবন মাযাহ ৩৮১৪; আবু দাউদ ১৫১৬; সাহীহাহ ৫৫৬ (আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)

 

মাজলিসের শেষে দু’আ মুনাজাত করা আমাদের অনেকেরই অভ্যাস ও চাহিদা। কিছু সময় মহান প্রতিপালকের স্মরণে কাটিয়ে শেষে নিজের মনের কিছু আবেগ, অনুভুতি, ব্যাথা-বেদনা ও চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করতে আমরা খুবই উৎসাহী। এছাড়া মাজলিসে কিছু সময় অবস্থানের কারণে মুমিনের হৃদয় বিনম্র হয় ও দু’আ করার মানসিকতা তৈরি হয়। সর্বোপরি সুন্নাতের আলোকে আমরা জানি যে, বিভিন্ন নেক আমলের পরে দু’আ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এভাবে আমরা ঈমানী চেতনা, হৃদয়ের আবেগ দিয়ে দ্বীনি মাজলিস শেষে সম্মিলিত দু’আ বা ‘আখেরী মুনাজাতের’ দলীল তালাশ করছি। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হল, আমরা কি এই সকল যুক্তি দিয়ে আমাদের ইচ্ছামতো কোনো বৈঠক শেষে অথবা বছরের নির্দিষ্ট কোনো এক জায়গায় জমায়েত হয়ে ‘আখেরী মুনাজাত’ নামক ‘ইবাদাত পালন করতে পারি কিনা?

 

মাজলিস শেষ করার সময় আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ না করা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় :

 

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘’কোনো কওমের লোকেরা কোনো সমাবেশে একত্রিত হওয়ার পর চলে যাবার সময় তাতে আল্লাহর স্মরণ না করেই চলে গেলে তা যেন গাধার শবদেহ। এবং তা তাদের জন্য পরিতাপের কারণ হবে’’। আবু দাউদ ৪৮৫৫ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

 

তথাকথিত ‘আখেরী মুনাজাত’ বনাম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর তরীকা অথবা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেভাবে কোনো মাজলিস বা বৈঠক শেষ করতেন :

 

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর জীবদ্দশায় অসংখ্যবার তাঁর সাহাবীদের নিয়ে মাজলিস, সভা বা বৈঠক করেছেন, তা’লিম দিয়েছেন, দ্বীন সম্পর্কে নাসীহাত করেছেন, কখনো কখনো দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না যে তিনি এ সমস্ত কাজ শেষে সবাইকে নিয়ে সম্মিলিত মুনাজাত করেছেন। বরং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা আমরা দেখতে পাই যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাজলিসের শেষে প্রায় তিন প্রকারের দু’আ করতে শিক্ষা দিয়েছেন।

 

প্রথম প্রকারঃ ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বি হামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’

 

হাদীস নং ১

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ”যে লোক মাজলিসে বসে প্রয়োজন ছাড়া অনেক কথাবার্তা বলেছে, সে উক্ত মাজলিস হতে উঠে যাওয়ার আগে যদি বলেঃ ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বি হামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’ (অর্থাৎ মহাপবিত্রতা আপনার, হে আল্লাহ। এবং প্রশংসা আপনারই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ও তাওবাহ করছি) তাহলে উক্ত মাজলিসে তার যে অপরাধ হয়েছিল তা ক্ষমা করে দেয়া হবে” তিরমিযি ৩৪৩৩; মিশকাতুল মাসাবীহ ২৪৩৩ (আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)

 

হাদীস নং ২

আবু বারযাহ আল-আসলামী (রা.) সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোনো মাজলিস শেষ করে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন বলতেন : ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বি হামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’ (অর্থাৎ মহাপবিত্রতা আপনার, হে আল্লাহ। এবং আপনারই প্রশংসা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ও তাওবা করছি) এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এখন আপনি যে বাক্যটি পড়লেন তা তো ইতিপূর্বে আপনি পাঠ করেননি! তিনি বললেন, মাজলিসে যা কিছু (ভুলত্রুটি) হয়ে থাকে এ কথাগুলো তার কাফফারা গণ্য হবে”। আবু দাউদ ৪৮৫৯ (আলবানি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)

 

হাদীস নং ৩

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল ‘আস (রা.) সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু বাক্য যা কোনো ব্যক্তি মাজলিস হতে উঠার সময় ‘তিনবার’ উচ্চারন করলে তা তার ঐ মাজলিসের কাফফারা হবে। আর যদি উক্ত বাক্যগুলো কোনো উত্তম মাজলিসে ও যিকরের মাজলিসে পাঠ করে তাহলে পুস্তিকায় সীলমোহর করার মতোই তা তার জন্য স্থায়িত্ব লাভ করে। বাক্যগুলো হল ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বি হামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’ (অর্থাৎ মহাপবিত্রতা আপনার, হে আল্লাহ। এবং আপনারই প্রশংসা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ও তাওবা করছি) আবু দাউদ ৪৮৫৭ (আলবানি ‘তিনবার’ শব্দটি বাদে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)

 

অর্থাৎ মাজলিস শেষে এই দু’আ পাঠ করলে, মাজলিসে উচ্চারিত বেহুদা ও অনর্থক কোনো কথা বলে থাকলে মহান আল্লাহ তায়ালার অসীম অনুগ্রহে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়। এই দু’আটি ‘কাফফারাতুল মাজলিস’ হিসাবে পরিচিত। এই দু’আটি মাজলিসের কাফফারা, যা মাজলিসে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তি মাজলিসের শেষে নিজে নিজে বলবেন।

 

দ্বিতীয় প্রকারঃ ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’

 

হাদীস নং ৪

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোনো মাজলিসে বসতেন অথবা সালাত পড়তেন তখন তিনি কিছু বাক্য উচ্চারন করতেন। উরওয়াহ (রা.) তাঁকে উক্ত বাক্যসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, কেউ যদি ভালো বাক্য বলে তাহলে সেগুলো কিয়ামাত পর্যন্ত তার জন্য মোহর স্বরূপ হবে। সে যদি অন্য ধরনের বাক্য বলে তা হলে সেগুলো তার জন্য কাফফারা স্বরূপ হবে। বাক্যগুলো হল ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক’ (অর্থাৎ মহাপবিত্রতা আপনার, হে আল্লাহ। এবং আপনারই প্রশংসা। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ও তাওবা করছি)। নাসায়ী ১৩৪৪ (আলবানি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)

 

তৃতীয় প্রকার : হাদীস নং ৫

ইবন উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিম্নোক্ত বাক্যে তাঁর সাহাবীগনের জন্য দু’আ না করে হঠাৎ কোনো মাজলিস হতে খুব কমই বিদায় হতেন : ‘’আল্লাহুমাকসিম লানা মিন খাশইয়াতিকা মা ইয়াহলু বাইনানা ওয়া বাইনা মাআসিকা ওয়ামিন ত্ব-আতিকা মা তুবাল্লিগুনা বিহি জান্নাতাকা আও মিনাল ইয়াকিনি মা তুহাওয়িনু বিহি আলাইনা মুসিবাতিদ দুনইয়া ওয়ামাততি’না বি আসমায়িনা ওয়া আবস্বারিনা ওয়া কু’ওয়াতিনা মা আহ’ইয়াইতানা ওয়াযআলহুল ওয়া রিসা মিন্না, ওয়াজআল সা’রনা আলা মান যোওয়ালামনা ওয়ান সুরনা আলা মান আ-দা-না ওয়ালা তাজ’আল মুসিবাতানা ফি দিনিনা ওয়ালা দুনইয়া আকবারা হাম্মিনা ওয়ালা মাবলাগা ইলমিনা ওয়ালা তুসাল্লিত্ব আলাইনা মান লা ইয়ারহামুনা’’

 

(অর্থাৎ ‘’হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার ভয় করার তাওফীক দান করুন, যে ভয় আমাদেরকে আপনার অবাধ্যতা থেকে রক্ষা করবে। এবং আপনি আমাদেরকে আপনার আনুগত্য করা তাওফীক দান করুন, যে আনুগত্যের দ্বারা আপনি আমাদেরকে জান্নাতে পৌঁছাবেন। এবং আপনি আমাদেরকে দৃঢ়বিশ্বাস প্রদান করুন, যে বিশ্বাস আমাদের জন্য দুনিয়ার বিপদ-আপদকে সহজ করে দিবে। আপনি আমাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও দেহের শক্তিকে আমাদের জন্য মরন পর্যন্ত অক্ষুন্ন রাখুন এবং এবং এগুলোকে বহাল রেখে আমাদের মৃত্যু দান করুন। যারা আমাদের উপর যুলম করেছে তাদের উপর আমাদের প্রতিশোধ অর্পণ করুন। এবং যারা আমাদের উপর শত্রুতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। আমাদের দ্বীনকে বিপদযুক্ত করবেন না, দুনিয়াকে আমাদের চিন্তা-ভাবনার মূল বিষয় বানাবেন না। এবং আমাদের জ্ঞানকে দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। আমাদের প্রতি মমতাবিহীন কাউকে আমাদের উপর ক্ষমতাবান করবেন না’’। তিরমিযি ৩৫০২ (আলবানি হাদীসটিকে হাসান বলেছেন) অন্য বর্ণনায়, তাবিয়ী নাফি (রহ.) বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা.) কোন মাজলিসে বসলে মানুষদের জন্য এ কথাগুলো বলে দু’আ না করে দাঁড়াতেন না’’ নাসায়ী ৬/১০৬

 

উপরোক্ত বক্তব্যগুলো লক্ষ্য করলে আমরা বুঝতে পারি, এ দু’আ করার সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তাঁর মাজলিসের সাহাবীগন, আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা.) বা তাঁর মাজলিসের লোকেরা সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দু’আ করেছেন বলে এমন কোন বর্ণনা নেই। সুতরাং প্রমানিত হল যে, সাহাবী-তাবিয়ীগনের সময়ও সর্বদা সকল মাজলিসের শেষে সবাই মিলে হাত তুলে সম্মিলিতভাবে দু’আ করার প্রচলন ছিল না। সাওয়াব লাভের সকল কর্ম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিক্ষা দিয়েছেন, বিদআত তথা নবউদ্ভাবিত অথবা নতুনত্বের কোনই অবকাশ নেই।

 

উম্মাতকে আল্লাহর নৈকট্যের সকল পথ বলে দেয়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দায়িত্ব এবং তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেছেন। তাঁর সুন্নাতের বাইরে গিয়ে আল্লাহর নৈকট্য বা সাওয়াব অর্জনের কোন পথ নেই:

 

আব্দুর রহমান আব্দ রাব্বিল কা’বা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ ‘’আমার পূর্বে প্রত্যেক নাবীরই দায়িত্ব ছিল যে, তিনি তাঁর উম্মাতের জন্য যত ভালো বিষয় জানেন সে বিষয়ে তাদেরকে নির্দেশনা দান করবেন। এবং তিনি তাদের জন্য যত খারাপ বিষয়ের কথা জানেন সেগুলি থেকে তাদেরকে সাবধান করবেন’’। মুসলিম ৪৬৭০-(৪৬/১৮৪৪) মুসলিম ৪৬৭০-(৪৬/১৮৪৪)

 

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনঃ ‘’জান্নাতের নিয়ে যাওয়ার ও জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার সকল বিষয়ই তোমাদেরকে বর্ণনা করে দেয়া হল’’। তাবারানী, আল-মু’জাম আল-কাবীর ২/১৫৫-১৫৬, নং ১৬৪৭

 

জঘন্য একটি বিদআত – ‘আখেরী মুনাজাত”

 

সম্মানিত মুসলিম ভাইগন! আপনারা উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর আলোকে অবগত হলেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে এরূপ বৈঠক শেষে এরুপ ‘আখেরী মুনাজাতের’ অস্তিত্ব ছিলনা। এরূপ সম্মিলিত মুনাজাত নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা সালাফে সালেহীনের কারও থেকে বিশুদ্ধ সানাদে পাওয়া যায়না। শাইখ আখতারুল আমান হাফিজাহুল্লাহ বলেন, বরং এভাবে সম্মিলিত দু’আ করার জন্য উমার বিন খাত্তাব (রা.) ইরাকের কিছু লোককে মাদীনায় ডেকে এনে তাদের দু’আ পরিচালনাকারীকে বেত্রাঘাত করেছিলেন মর্মে বিশুদ্ধ আসার এসেছে। মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, আসার নং ২৬৭১৫, ৮/৫৫৮ পৃ. অতএব টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার এই আখেরী মুনাজাতটি অবশ্যই একটি জঘন্য বিদআত ব্যতীত আর কিছুই নয়। উমার (রা.) আজ বেচে থাকলে ইজতেমার আখেরী মুনাজাতকারীকে কী পুরস্কার দিতেন তা আশা করি বুঝতে পেরেছেন?

 

বিদআতি আমল আল্লাহর নিকট কবুল হবে না এবং বিদআতের পরিনাম জাহান্নাম:

 

আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সেই কাজটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে। সুন্নাহের বাইরে কোনো আমল গ্রহণযোগ্য নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরন বাদ দিয়ে মনগড়াভাবে অথবা নিজস্ব খেয়াল-খুশি মতো ‘ইবাদাতের সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলামে ‘ইবাদাত হচ্ছে ‘তাওকিফি’। অর্থাৎ কোনো কিছুকে ‘ইবাদাত হিসাবে সাব্যস্ত করতে হলে তার জন্য দলীল লাগবে। দলীল বিহীন কোনো কাজকে ‘ইবাদাত বলার কোনো সুযোগ নেই।

 

দলীল নং ১

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘’যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল, তা প্রত্যাখ্যাত”। বুখারী ২৬৯৭; মুসলিম ১৭১৮; ইবন মাযাহ ১৪; আবু দাউদ ৪৬০৬; রিয়াদুস স্বালিহিন ১৭৩

 

দলীল নং ২

জাবির (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ‘’নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম কথা আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম রীতি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)- এর রীতি। আর নিকৃষ্টতম কাজ (দ্বীনে) নব আবিষ্কৃত কর্মসমূহ এবং প্রত্যেক বিদ’আত ভ্রষ্টতা’’। মুসলিম ১৪৩৫(ক)-(৪৩/৮৬৭); ইবন মাযাহ ৪৫

 

দলীল নং ৩

আবু নাজীহ ইরবায ইবন সারিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : ”স্মরণ রাখো! তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদ’আত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ প্রত্যেক বিদ’আতই ভ্রষ্টতা’’ আবু দাউদ ৪৬০৭; রিয়াদুস সালিহীন ১৬১ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

 

দলীল নং ৪

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর খুৎবায় আল্লাহ তায়ালার উপযুক্ত প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করতেন। অতঃপর বলতেনঃ ”আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই। আর তিনি যাকে ভ্রষ্ট করেন, তাকে হিদায়াতদানকারী কেউ নেই। সবচাইতে সত্য কথা আল্লাহর কিতাব। সর্বোত্তম পথ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দেখানো পথ। নিকৃষ্ট কাজ (দ্বীনের মধ্যে) নতুন আবিস্কার। সকল নতুন আবিস্কার বিদআত। আর সকল বিদআতের পরিনতি জাহান্নাম” নাসায়ী ১৫৭৮ (আলবানি সহীহ বলেছেন)

 

‘আখেরী মুনাজাত’ নামের মধ্যেই ধোঁকা!

 

আমরা মুনাজাতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে যাচ্ছি না। একজন মুমিনের কোনো মুনাজাতই আখেরী হতে পারে না। কারণ সে জানেনা তাঁর শেষ কবে। এমন নয় যে সে বছরের কোনো এক সময় মুনাজাত করবে অথবা তার আশায় বসে থাকবে। সুতরাং সাবালক, সুস্থ মস্তিস্ক ও জ্ঞান থাকা অবস্থায় একজন মুসলিমের জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুনাজাত তাকে তাঁর রবের নিকট মুনাজাত জারি রাখতে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।

 

বি. দ্র. দু’আ গুলো বাংলায় সঠিকভাবে উচ্চারন সম্ভব নয়, আরবি দেখে সঠিকভাবে উচ্চারন করার অনুরোধ রইলো।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ রাহে বেলায়েত, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) পৃষ্ঠা নঃ ৬৩০-৬৩৩

শাইখ আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম, লিসান্স মাদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি দা’ঈ, ইহয়াউত তুরাস আল ইসলামী, কুয়েত।

 

 

সংকলকঃ সত্যান্বেষী রিসার্চ টীম

© Shottanneshi – সত্যান্বেষী কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

 

 

(Visited 205 times, 1 visits today)

Follow me!

Related Post

banner ad
Powered by WordPress | Designed by Shottanneshi Research Team